বগুড়ার গাবতলী উপজেলার একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানার নামে জেলা পরিষদের বরাদ্দ করা সরকারি অনুদানের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া কমিটি গঠন করে ব্যাংক হিসাব খোলেন উপজেলা তাঁতী দলের সাধারণ সম্পাদক দৌলত জামান খানসহ কয়েকজন। সেই হিসাবের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রথম কিস্তির এক লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন তারা।
এ ঘটনায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বগুড়া সদর থানায় এবং জেলা পরিষদে লিখিত অভিযোগ করেছে। গত ৬ জুলাই জেলা পরিষদে অনুষ্ঠিত শুনানিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করলেও দুই সপ্তাহের বেশি সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো টাকা ফেরত পাননি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।
এতিম শিশু ও দরিদ্র মেয়েদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সুযোগ করে দিতে ২০০৭ সালে গাবতলী উপজেলার সারোটিয়া পূর্বপাড়ায় ‘ফাতেমাতুজ জোহরা (রা.) মাদ্রাসা ও এতিমখানা’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠাতা আখতার হোসেন খান মোহনের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী শারমিন সুলতানার নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি পরিচালনা কমিটি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছে।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের করা অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট জেলা পরিষদে সরকারি অনুদানের আবেদন করা হয়। চলতি অর্থবছরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ১৬৮ নম্বর প্রকল্পে প্রতিষ্ঠানটির জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ মঞ্জুর করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও গাবতলী উপজেলা তাঁতী দলের সাধারণ সম্পাদক দৌলত জামান খান গত বছরের ১১ ডিসেম্বর একটি ভুয়া প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করেন। সেখানে নিজেকে সভাপতি এবং সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। পরে শহরের রূপালী ব্যাংকের একটি মহিলা শাখায় মাদ্রাসার নামে ব্যাংক হিসাব খুলে বরাদ্দের প্রথম কিস্তির এক লাখ টাকা তুলে নেন।
দীর্ঘ সময় পার হলেও বরাদ্দের টাকা না পেয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে বিষয়টি জানতে পারে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। পরে তারা বগুড়া সদর থানা ও জেলা পরিষদের প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ৬ জুলাই জেলা পরিষদে উভয় পক্ষকে নিয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, শুনানিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ভুয়া কমিটি গঠন ও টাকা উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেন এবং তিন কার্যদিবসের মধ্যে টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও কোনো টাকা ফেরত পাওয়া যায়নি।
মাদ্রাসা ও এতিমখানার সভাপতি একরাম হোসেন বলেন, প্রতারণা করে এতিমদের টাকা মেরে খাওয়া হয়েছে। এটা স্পষ্ট জালিয়াতি। যারা এ কাজের সঙ্গে জড়িত, তারা মাদ্রাসার কেউ নন; তারা কোনো দিন এ প্রতিষ্ঠানে আসেননি বা কোনো সাহায্যও করেননি।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শারমিন সুলতানা বলেন, আমাদের বৈধ কমিটি বাদ দিয়ে আরেকটি কমিটি গঠন করে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে এবং প্রথম কিস্তির টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। এমনকি তারা দ্বিতীয় কিস্তির টাকার জন্যও আবেদন করেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দৌলত জামান খান বলেন, অ্যাডহক কমিটি করে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। আবেদন আমরাই করেছিলাম। তবে এটি সাগর ভাই (শাহাদাত খান সাগর) পাস করিয়ে এনেছেন।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে গাবতলী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শাহাদাত খান সাগর বলেন, আমি এসবের কিছুই জানি না এবং এর সঙ্গে জড়িতও নই। অযথাই আমার নাম জড়ানো হচ্ছে।
জেলা তাঁতী দলের সভাপতি সারোয়ার হোসেন জানান, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জেলা পরিষদের প্রশাসক এ কে এম আহসানুল তৈয়ব জাকির বলেন, ঘটনাটি জানার অল্প সময়ের মধ্যেই দুই পক্ষকে ডাকা হয়েছিল। তাদের কথা শুনে বিষয়টি সমাধানযোগ্য মনে হওয়ায় আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করে দেওয়া হয়েছে।
বগুড়া সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহাফুজ আলম জানান, অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং তা তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।