Image description

বাংলাদেশের ১৬তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। আজ শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুরে স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। ‘গুরুতর অসুস্থতাজনিত’ কারণ দেখানো হলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক চাপের কারণে এই পদত্যাগ।

তবে এবারই প্রথম নয়, এর আগে নানা কারণে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের আরও ৫ জন রাষ্ট্রপতি। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির পদে থেকে নিহত হয়েছেন দুজন। আর মৃত্যুবরণ করেছেন একজন রাষ্ট্রপতি। পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতিরা হলেন— খন্দকার মোশতাক আহমদ, আবদুস সাত্তার, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং মো. সাহাবুদ্দিন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বাংলাদেশের জোরপূর্বক পদত্যাগের ঘটনা প্রথম ঘটে চতুর্থ রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদেরস সঙ্গে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনে পরিবর্তন আনেন এবং ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ জারি করেন, যা ১৫ আগস্টের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা দেয়। একই বছর ৩ নভেম্বর আরেক অভ্যুত্থানে তিনি পদচ্যুত হন।

দেশের সপ্তম রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৬৬% ভোট পেয়ে তিনি নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করেন। ওই বছরের ২৪ মার্চ সামরিক আইন জারি করে প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন সেনাপ্রধান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ।

নবম রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর নাগাদ প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে দেশ শাসন করেন। ওই দিন তিনি দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এএফএম আহসানুদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে নিজের অধিকারে নেন। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই দলের মনোনয়ন নিয়ে ১৯৮৬ সালে পাঁচ বছরের জন্য দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরশাদের স্বৈরাচারের বিরূদ্ধে দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে সকল বিরোধী দল সম্মিলিতভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে।

১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতি চালুর পর হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের পতন পর্যন্ত এটি কার্যকর ছিল। ১৯৯১ সালে সংসদীয় পদ্ধতি চালু হয় এবং সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু চলে যায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। এর মধ্যে ২০০২ সালে দেশের ১২তম রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা পদত্যাগ করেন। একিউএম বদরুদ্দোজা ২০০১ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে রাজনৈতিক মতবিরোধ ও দলীয় চাপের কারণে তিনি ২০০২ সালে স্বল্পমেয়াদি সময়ে পদত্যাগ করেন।

তথ্য বলছে, সাত মাসাধিককাল রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০০২ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিরপেক্ষ থেকে জিয়াউর রহমানের সমাধি পরিদর্শন না করার সিদ্ধান্ত নেন। তার এই পদক্ষেপে বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপির অনেক নেতা তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনেন। সংসদে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাবেরও পরিকল্পনা চলছিল। নিজ দলের মধ্যে বিরাজমান ক্ষোভ ও ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে তিনি জুনের ২১ তারিখ বিএনপি চেয়ারপারসন ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবনে তার সাথে সাক্ষাত করেন ও পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগের পর ড. চৌধুরী বিএনপি থেকেও পদত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে মুন্সীগঞ্জ-১ আসন থেকে নির্বাচিত তার পুত্র মাহি বি চৌধুরী ও ও বিএনপির আরেকজন সাংসদ এম এ মান্নান সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন।

এ ছাড়া ১৯৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকালে দুজন রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেন। জোরপূর্বক বা রাজনৈতিক বিরোধজনিত কারণে এসব পদত্যাগের ঘটনা ঘটেনি। রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামো পরিবর্তনের অংশ হিসেবে তারা পদত্যাগ করেন। মূলত দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান সংসদীয় শাসনব্যবস্থা চালু করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলে তিনি রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৭৩ সালের ১০ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে পুনঃনির্বাচিত হন। তবে একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন এবং একজন মন্ত্রীর পদমর্যাদায় বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষ দূত নিযুক্ত হন।

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পদত্যাগ করলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ। তিনি ২৪ জানুয়ারি ১৯৭৪ সালে অস্থায়ী থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে ২৭ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করেন। ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। এদিন একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল প্রবর্তন করে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৫ আগস্টে শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর মোহাম্মদউল্লাহকে প্রজাতন্ত্রের উপরাষ্ট্রপতি করা হয়। একই বছরের ৭ নভেম্বর সংবিধানের ৫১(৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে তিনি উপরাষ্ট্রপতির পদ থেকেও পদত্যাগ করেন।

এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন। একইভাবে ৬ষ্ঠ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। আর ২০১৩ সালে দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যুবরণ করেন ১৪তম রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান।