Image description

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনাকে আরও একা করে দেবে। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ মনোনীত এই রাষ্ট্রপতির বিদায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে হাসিনার শেষ পরিচিত মিত্রও প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছেন। নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের ঘোষণার প্রেক্ষাপটে এই পদত্যাগ রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ এই পদত্যাগ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের আগে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের শেষ স্তম্ভটিকেও ভেঙে দিচ্ছে।

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং দেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন আজ শুক্রবার তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদের মাঝপথে পদত্যাগ করবেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বিষয়টি জানিয়েছেন তাঁর মুখপাত্র। এই ঘোষণা এল এমন এক সময়ে, যার কয়েকদিন আগেই শেখ হাসিনা বলেন—আদালতের রায়ে দণ্ডিত হওয়ার পর তিনি আত্মসমর্পণের জন্য নির্বাসন থেকে দেশে ফিরবেন।

রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের ফলে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মাস আগে উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রক্ষমতায় তাঁর আর কোনো মিত্র অবশিষ্ট থাকবে না। তাঁর দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ এবং ২০২৪ সালে প্রাণঘাতী ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে তাঁর সরকার পতনের পর দলটির বহু নেতা-কর্মী কারাগারে গেছেন অথবা আত্মগোপনে।

সাহাবুদ্দিনের মুখপাত্র তাঁর পদত্যাগের কারণ জানাননি। তবে বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করার পর, তাঁর সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে সরকার সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের জন্য চাপ দেয়।

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ১৭ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার মুসলিম প্রধান দেশ বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সরকারের প্রচেষ্টার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক এই দেশটি গত দুই বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মুখপাত্ররা এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেননি। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব সারওয়ার আলম রয়টার্সের আগের একটি প্রতিবেদন নিশ্চিত করে বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কার্যকর হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্পিকার আগামীকাল থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরলে রাষ্ট্রপতি তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেবেন।’ সারওয়ার আলম জানান, সাহাবুদ্দিন পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সংসদের স্পিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন, যতক্ষণ না নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে অফিস আওয়ারের বাইরে হওয়ায় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের দপ্তরে পাঠানো ই-মেইল এবং ফোনকলের জবাব পাওয়া যায়নি।

গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থান দমনের নির্দেশ দেওয়ার দায়ে শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দমন-পীড়নে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিল। নির্বাসন থেকে শেখ হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

ভারত থেকে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের খবর প্রকাশের পর তারেক রহমান সরকারের ওপর জনমত আরও জোরালো হয়েছে, যাতে উচ্চপদে থাকা শেখ হাসিনার শেষ অবশিষ্ট মিত্রদেরও সরিয়ে দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। কার্যনির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার হাতে ন্যস্ত। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন ক্ষমতায় আর কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয় এবং রাষ্ট্রপতির পদটি আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পায়।

বর্তমানে ৭৬ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে দলটি নিষিদ্ধ। তিনটি সূত্রের একটির ভাষ্য অনুযায়ী, সাহাবুদ্দিন গত মঙ্গলবারই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে তিনটি সূত্রই পরিচয় প্রকাশে রাজি হননি।

মন্তব্য জানতে বারবার ফোন ও বার্তা পাঠানো হলেও সাহাবুদ্দিন কোনো সাড়া দেননি। তবে তিনি গত ডিসেম্বর রয়টার্সকে বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি পদত্যাগের পরিকল্পনা করছেন। কারণ, শেখ হাসিনার সরকারকে প্রতিস্থাপনকারী আগের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাঁকে কার্যত পাশ কাটিয়ে রেখেছিল।

শেখ হাসিনা রয়টার্সকে আরও বলেন, তিনি এবং তাঁর দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। নিষিদ্ধ হওয়ার আগে আওয়ামী লীগ ছিল বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল, এবং এখনো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থনের ভিত্তি রয়ে গেছে।

শীর্ষনিউজ/