সরকারের ১২০ কোটি টাকার প্রকল্প আটকে দেওয়ায় নিশ্চয়ই অনেক কর্মকর্তা ও ঠিকাদার দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন! যেখানে সরকারি টাকায় বড় প্রকল্প মানেই ভাগ-বাটোয়ারা ও অর্থ নয়-ছয়ের এক উৎসব, সেখানে বাঁধ সেধেছে পরিকল্পনা কমিশন।
এই প্রকল্পের মোট ১১টি খাতের মধ্যে শুধু এই চারটি খাতেই সমজাতীয় সরকারি প্রকল্পের তুলনায় প্রায় ২৯ কোটি ৮৯ লাখ ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। আর বাজারদরের তুলনায় প্রায় খরচ বেশি প্রায় ৪৭ কোটি ৬৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
প্রকল্প এলাকা অন্য কারও নয়–খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিজ জেলা বগুড়া। আর যার মন্ত্রণালয়ের আওতায় এই আয়োজন, তিনি হলেন একই এলাকার মহাশক্তিধর এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
ঘটনা হলো, বগুড়া জেলায় ‘সমন্বিত পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন অবকাঠামো উন্নয়ন’ নামের একখানা ১২০ কোটি ৪৯ লাখ টাকার প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়নের কর্তৃপক্ষ হলো এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে (ডিপিএইচই)।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য অতি মহান–২০৫০ সাল পর্যন্ত নিরাপদ পানি সরবরাহ করা। কিন্তু প্রকল্পের বাজেট শিট খুলতেই পরিকল্পনা কমিশন কর্মকর্তাদের চোখ চড়কগাছ! জেলা-উপজেলায় একখানা পাবলিক টয়লেট বানাতে খরচ ধরা হয়েছে ৩৮ লাখ টাকা। অথচ সাম্প্রতিক বন্যাকবলিত এলাকার প্রকল্পেও পাবলিক টয়লেট নির্মাণের বাজেট ৩০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। মাত্র পাঁচ বছর আগেও সরকারি প্রকল্পে এই বাজেট ছিল ১৭ লাখ টাকা।
আবার মাত্র ২০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার একখানা টুইন পিট (গর্ত করে সিমেন্টের রিং বসানো) ল্যাট্রিনের খরচ হাঁকানো হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। অথচ সরকারেরই অন্যান্য প্রকল্পে এই বাজেট ৩৫ হাজার ১১০ টাকা। ভিভিআইপি’দের এলাকা বগুড়ায় ল্যাট্রিনেরও হয়তো কদর আলাদা, তাই সেখানে প্রতি ল্যাট্রিনে অতিরিক্ত ৪৫ হাজার টাকা ঢালার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।
নলকূপের ক্ষেত্রে হরিলুটের পরিকল্পনা ছিল আরও চমকপ্রদ। সারা দেশে যে ‘তারা’ নলকূপ বসাতে খরচ হয় ২৮ হাজার টাকা, বগুড়ায় সেটি বসাতে বাজেট করা হয়েছিল ৭০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি নলকূপেই পকেটে যাবে ৪২ হাজার টাকার অতিরিক্ত বরাদ্দ।
অথচ সাধারণ হিসাব বলছে, বগুড়ার সমতল এলাকার নরম মাটিতে বোরিং, পাইপ, পাম্প হেড, রড ও চাতাল মিলিয়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার বেশি খরচই করা যায় না। বরেন্দ্র অঞ্চলেও তা সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকা।
আবার কমিউনিটি নলকূপের বেলায় অন্য প্রকল্পে ৬ লাখ টাকা ধরা হলেও বগুড়ায় বাজেট ছিল ৭ লাখ টাকা। বাস্তবে ৩-৪ শত ফুট গভীর সাবমার্সিবল নলকূপে খরচ যেখানে দেড় লাখ টাকা আর বরেন্দ্র এলাকার শক্ত মাটিতে গভীর বোরিংয়ে আড়াই লাখ টাকা, সেখানে ৭ লাখ টাকার বিশাল বাজেট দিয়ে বাকি কয়েক লাখ টাকার কী বন্দোবস্ত করা হচ্ছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
একই অবস্থা সাবমার্সিবল পাম্প আর পানির ট্যাংকসহ গভীর ও অগভীর নলকূপের ক্ষেত্রেও। সমতল এলাকায় মাত্র ৪৫ থেকে ৬০ হাজার টাকায় এক হাজার লিটারের ট্যাংক, পাম্প ও ওয়্যারিং সহ পুরো সেটআপ রেডি করা গেলেও, বগুড়ার এই প্রকল্পে খরচ দেখানো হয়েছিল এক লাখ ১০ হাজার থেকে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
সরকারি নীতিমালা অনুসারে, ৫০ কোটি টাকার বেশি খরচের প্রকল্পে কারিগরি, আর্থিক ও সামাজিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সমীক্ষা করলে যদি থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ে! তাই সমীক্ষা ছাড়াই সোজা পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের টেবিলে হাজির করা হয়েছিল এই প্রকল্প।
বগুড়ায় ১২টি ‘বিলাসী’ পাবলিক টয়লেট নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। সমজাতীয় প্রকল্পের তুলনায় কেবল এই খাতেই বেশি ব্যয় ৯১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
এ ছাড়া ৬৬৯টি কমিউনিটি নলকূপ স্থাপনে ৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হলেও বাজারদর অনুযায়ী খরচ হওয়ার কথা ২০ কোটি ৭ লাখ টাকা। এমনকি সমজাতীয় অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের চেয়েও বগুড়ার প্রকল্পে ৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে।
এই প্রকল্পে ২ হাজার ৭২৫টি টুইন পিট ল্যাট্রিন স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা সমজাতীয় প্রকল্পের তুলনায় ১২ কোটি ৩৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা বেশি।
আর ২১৮০টি ৬ নম্বর অগভীর নলকূপ স্থাপনে সমজাতীয় প্রকল্পের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ৯ কোটি ১৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
প্রকল্পের এমন জাদুকরী খরচের পক্ষে ডিপিএইচই-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ফাহিম হাসান সিরাজীর ব্যাখ্যাগুলোও বেশ চমকপ্রদ। নলকূপের দাম এত বেশি কেন? এর জবাবে তিনি বললেন, আগে থেকে তো জানা যায় না কত গভীর যেতে হবে, তাই ডিপিপিতে সর্বোচ্চ ১ হাজার ফুট ধরে হিসাব করা হয়েছে। পরে নাকি কাজের সময় আসল খরচের হিসাব করা হয়।
তবে ইতিহাস বলে, দরপত্রে ১ হাজার ফুট গর্ত করার পূর্ণ বিল ঠিকাদাররা ঠিকই তুলে নেন। আর বাস্তবে অনেক কম গভীরতায় ফিনিশিং দিয়ে কাচা টাকা পকেটে পুরেন।
ল্যাট্রিনের খরচে প্রকৌশলী সিরাজীর দাবি: আগের ৩৫ হাজার টাকার ল্যাট্রিন টিনের হলেও এবার ইটের দেয়ালের বিলাসবহুল ঘর করা হচ্ছে, তাই খরচ ৮০ হাজার টাকা।
এই প্রকৌশলীর কথা হলো ২০১৯ সালের পুরনো রেটে আর কাজ হবে না। ২০২৬ সালের নতুন রেট শিডিউল তৈরি হচ্ছে, সেটারই দোহাই দিয়ে তিনি নির্বিকারভাবে জানালেন, ‘একটু বাড়িয়ে আমরা প্রস্তাব তৈরি করেছি। পরিকল্পনা কমিশন বিবেচনা করলে পাস হবে, না হলে ফিরিয়ে দেবে।’
এদিকে ‘ময়লা মাখা হাত ধুয়ে ফেলা’র কায়দায় এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার বললেন, ‘মন্ত্রণালয় তো খরচ ঠিক করে না, ইঞ্জিনিয়াররা যে হিসাব দেয় সেটাই ফাইনাল।’
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের যুগ্মপ্রধান মোঃ হায়দার আলী অবশ্য সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সরকারের নির্ধারিত রেটের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, নতুন করে প্রকল্প সংশোধনের বিকল্প নেই।
উপপ্রধান দেবোত্তম সান্যালও অতিরিক্ত খরচগুলো যৌক্তিক করার ওপর জোর দিয়েছেন।
পুরো আয়োজন দেখে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মন্তব্য করেন, এই প্রকল্প পাস হলে বোঝা যেত রূপপুরের বালিশ কাণ্ডকেও হার মানাতে যাচ্ছে ডিপিএইচই। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেভাবে বাড়িয়ে বাজেট ধরে আর্থিক লুটপাট চালানো হতো, এই প্রকল্পে হুবহু সেই একই মডেল অনুসরণ করা হয়েছে।
ড. ইফতেখার সতর্ক করে দেন, এই লুটপাটের ফলেই আওয়ামী লীগকে গণআন্দোলনে ক্ষমতা হারাতে হয়েছে। এখন বিএনপি ক্ষমতায় এসে যদি তাদের প্রভাবশালী নেতাদের এলাকায় আগের আমলের একই মডেল ধরে সরকারি অর্থ নয়-ছয়ের এই পুরনো খেলা চালু রাখে, তবে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সামনে দলটিকে চরম খেসারত দিতে হতে পারে।
দিনশেষে রূপপুরের বালিশ কাণ্ডে একটা বালিশের দাম ৫ হাজার ৯৫৮ টাকা আর ভবনে তোলার খরচ ৭৬০ টাকা দেখিয়ে যে মহাকাব্য রচনা হয়েছিল, বগুড়ার এই ৩৮ লাখ টাকার শৌচাগার আর ৭০ হাজার টাকার নলকূপের প্রকল্প পাস হলে সেটিও হতো আরেক ‘শৌচাগার কাণ্ড’।