Image description

জনপ্রশাসনে পদোন্নতির প্রথম বড় ধাপেই রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে বিএনপি সরকার। মেধাভিত্তিক প্রশাসন গড়ার যে অঙ্গীকার সরকার দিয়েছিল, এই ঘটনা সেই প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

গত ৯ জুলাই গভীর রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১৭৯ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার পর থেকেই শুরু হয় এই বিতর্ক।

এবার অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও অতীতে বিভাগীয় শাস্তি পাওয়া ব্যক্তিরা পদোন্নতি পেয়েছেন। অন্যদিকে, জ্যেষ্ঠ ও দক্ষ অনেক প্রার্থীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ২৫তম বিসিএস ব্যাচের মেধা তালিকায় শীর্ষ স্থানে থাকা দুই কর্মকর্তাও পদোন্নতি পাননি। এর ফলে প্রশাসনিক মহলে দেখা দিয়েছে চরম ক্ষোভ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জ্যেষ্ঠ ২৪তম ব্যাচের চেয়ে জুনিয়র ২৫তম ব্যাচ থেকে অনেক বেশি কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন। যেখানে ২৪তম ব্যাচের ১৮৪ জনের মধ্যে মাত্র ৪৫ জন পদোন্নতি পান, সেখানে ২৫তম ব্যাচের ২০৪ জনের মধ্যে পদোন্নতি পেয়েছেন ৭২ জন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এই পদোন্নতির পুরো প্রক্রিয়াটি নিজের মতো করে সাজিয়েছেন।

অন্যদিকে এক সাবেক সচিবের দাবি, সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করেই এই তালিকা অনুমোদন দিয়েছে।

বিতর্কের জবাবে এসএসবি প্রধান ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘সব সরকারেরই কিছু না কিছু রাজনৈতিক বিবেচনা থাকে।’

অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পদোন্নতি, তারপর বাতিল

পদোন্নতির তালিকার ৫৩ নম্বরে থাকা মাইনুল হক ভূঁইয়া গত ৩০ জুনই অবসরে গেছেন। অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির পদোন্নতির বিষয়টি জানাজানি হলে তুমুল সমালোচনা শুরু হলে পরে দ্রুত তা বাতিল করা হয়।

তবে বিতর্ক শুধু একজনকে নিয়েই থামেনি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম অতীতে শাস্তিপ্রাপ্ত  হওয়া সত্ত্বেও পদোন্নতি পেয়েছেন। রাজধানীর ডেমরায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে অপকর্মের দায়ে তার তিন বছরের ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে আপিলেও বহাল থাকে।

একইভাবে, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব মো. শাহিনুর ইসলাম পূর্ববর্তী সাজা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি পেয়েছেন। নীলফামারীতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক থাকাকালে তিস্তা নদীর বালুমহাল ইজারার টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে ভুয়া চুক্তি করার অপরাধে তাকে এক বছরের জন্য বেতন স্কেলের সর্বনিম্ন ধাপে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো, গত ২৮ মে ঈদুল আজহার পশুর বর্জ্য সময়মতো পরিষ্কার না করায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বরখাস্ত হওয়া উপসচিব ছাদেকুর রহমানকেও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে এখনো তদন্ত চলছে, তবে পদোন্নতি দিয়ে তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যুক্ত রাখা হয়েছে।

জ্যেষ্ঠতা এবং বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

পরপর তিনবার পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হওয়া ২৪তম ব্যাচের এক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, কেন তাকে বাদ দেওয়া হলো তার কোনো কারণ তিনি জানেন না।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘হয়তো সরকার আমাকে তাদের নিজস্ব লোক মনে করে না।’

সাধারণত এসএসবি উপসচিব থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত পদোন্নতির বিষয়টি মূল্যায়ন ও সুপারিশ করে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে এই বোর্ডে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, পিএমও সচিব, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএন্ডএজি) এবং জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবরা থাকেন।

এবারের পদোন্নতির আগে এই বোর্ড দীর্ঘ আট মাস ধরে প্রার্থীদের নথি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। এরপর ফাইলটি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

তবে একের পর এক ভুলের ঘটনা পুরো এই বাছাই প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার জানান, যুগ্ম সচিব পদে কোনো পরীক্ষা হয় না। বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর), গোয়েন্দা রিপোর্ট ও কাজের পারফরম্যান্স দেখে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তার মতে, যাচাই-বাছাইয়ের সময় এসএসবি চরম অবহেলা করেছে।

আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘এখানে মূল ক্ষতিটা হয়েছে সরকারের ভাবমূর্তি ও বিশ্বাসের’।

‘রাজনৈতিক বিবেচনা সব সরকারেই থাকে’

অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি স্বীকার করেন এটি একটি ভুল ছিল এবং তা সংশোধন করা হয়েছে। শাস্তি পাওয়া কর্মকর্তাদের বিষয়ে তার ব্যাখ্যা, তাদের আগের মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছিল বলেই পদোন্নতি সম্ভব হয়েছে।

তবে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের বিষয়ে চাপ দেওয়া হলে নাসিমুল গনি সরাসরি বলেন, ‘আপনি কি আওয়ামী লীগের এমন কাউকে পদোন্নতি দেবেন যিনি নির্বাচনের সময় ডিসি ছিলেন? এসব পরিস্থিতি তো তৈরি হবেই।’

সরকারি কর্মকর্তাদের কি এখন কেবল দলীয় চশমায় দেখা হচ্ছে?—এই প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘যারা নির্বাচনের সময় ডিসি হিসেবে সরাসরি আওয়ামী লীগকে সাহায্য করেছিলেন, তারা এই সরকারের অধীনে পদোন্নতি পাবেন না। আগের সরকারও একই কাজ করেছিল।’

সব মিলিয়ে, এই পদোন্নতি বিতর্ক নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক প্রশাসন গড়ার বিএনপি সরকারের অঙ্গীকারকে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে বেসামরিক প্রশাসন কি আদৌ নিরপেক্ষ থাকতে পারবে কিনা—সেই প্রশ্ন আবার সামনে চলে এসেছে।