নয় মাসেও হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুনের ক্ষত সারেনি। এতে করে চালু হয়নি স্থায়ী আমদানি কার্গো শেড। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে খোলা আকাশের নিচে শত শত টন আমদানি পণ্য ভিজে নষ্ট হচ্ছে। আধুনিক ওয়্যারহাউজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, বারকোড বা আরএফআইডি-ভিত্তিক ট্র্যাকিং চালু না থাকায় পণ্য খুঁজে বের করা, সংরক্ষণ ও ডেলিভারিতে অস্বাভাবিক বিলম্ব হচ্ছে। এছাড়াও গুদাম সংকট, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে অব্যবস্থাপনা এবং পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতায় শতকোটি টাকার পণ্য ঝুঁকিতে পড়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার কাঁচামাল সরবরাহ। দেশের বাণিজ্যেও চাপ বাড়ছে। দ্রুত সংকটের সমাধান না হলে আমদানি-রপ্তানি সরবরাহ ব্যবস্থা, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিন গড়ে ৪৫ থেকে ৫০টি ফ্লাইট অবতরণ করে। এর মধ্যে ৫ থেকে ৮টি চার্টার কার্গো ফ্লাইট এবং ৪০ থেকে ৪৫টি নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট, যেগুলোতেও আমদানি কার্গো আসে। নিয়মিত সাধারণত অবতরণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফ্লাইটের পণ্য যাচাই-বাছাই শেষে নোটিশ অব অ্যারাইভাল (এনওএ) দেওয়া হয়। তবে চার্টার কার্গো ফ্লাইটের ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগে ৩-৪ দিন। প্রতিদিন নিয়মিত ফ্লাইটে ৩৫০-৪০০ টন কার্গো আসায় কয়েকদিনের মধ্যেই প্রায় ১ হাজার ৫০০ টন পণ্য শুধু নোটিশ অব অ্যারাইভালের অপেক্ষায় বিমানবন্দরে জমে থাকে। এরপর বিমান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পণ্য বুঝে নেওয়ার পর কুরিয়ার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্টিং এবং প্রকৃত আমদানিকারকের কাছে সরবরাহ করতে আরও ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগে। ফলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। কার্গো ভিলেজের ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত পণ্য জমে থাকায় সৃষ্টি হয় তীব্র সংকট। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পাদনের পরও গাদাগাদি করে রাখা পণ্যের মধ্যে নির্দিষ্ট চালান খুঁজে বের করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এতে একদিকে যেমন পণ্য ছাড়ে বিলম্ব হচ্ছে, অন্যদিকে খোলা জায়গায় পড়ে থাকা মালামাল টানা বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
গত বছরের ১৮ অক্টোবর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বিমানবন্দরের কার্গো ওয়্যারহাউজ পুড়ে যায়। এরপর ৯ মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো নতুন ওয়্যারহাউজ নির্মাণ করা হয়নি। এমনকি শেডটি দ্রুত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে কাজের গতি ছিল অত্যন্ত ধীর। ফলে কার্গো ভিলেজের ধারণক্ষমতা কমে যায়। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ নতুন চালান এলেও রাখার পর্যাপ্ত সংকুলান না থাকায় অনেক পণ্য খোলা জায়গায় স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে সেই পণ্যই ভিজে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিকমানের বিমানবন্দরে কোটি কোটি টাকার আমদানি পণ্য খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকার এমন নজির বিশ্বে আর কোথাও নেই।
ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল কবির ভূঁইয়া মিঠু বলেন, খোলা আকাশের নিচে মাটিতে পণ্য পড়ে থাকলে ওপর থেকে বৃষ্টির পানি পড়বে, নিচ থেকে পানি উঠবে-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত কার্গো শেডের সংস্কার কাজ ৯ মাসেও শেষ না হওয়া বড় ধরনের ব্যর্থতা। তিনি বলেন, কোটি কোটি টাকার আমদানি পণ্য বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে থাকলেও তা দেখার যেন কেউ নেই। সময়মতো ক্ষতিগ্রস্ত শেডটি সংস্কার করে বিকল্প সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। এতে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি শিল্পকারখানার কাঁচামাল সরবরাহ ও উৎপাদনও ঝুঁকিতে পড়ছে। তার মতে, আধুনিক ওয়্যারহাউজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, বারকোড বা আরএফআইডি প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল কার্গো ট্র্যাকিং চালু না করলে এ সংকট থেকে বের হওয়া কঠিন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কার্গো ব্যবস্থাপনার দায় এড়ানোর সংস্কৃতিও স্পষ্ট। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বলছে, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সময়মতো উপস্থিত না হওয়ায় অনেক পণ্য ডেলিভারি দেওয়া যায় না। বিপরীতে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত গুদাম আধুনিক ওয়্যারহাউজ ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ সমন্বয়ের অভাবেই পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দায় কার তা নিয়ে দুপক্ষের পালটাপালটি বক্তব্য থাকলেও ক্ষতির বোঝা বইতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। তারা বলেন, বিমানপথে সাধারণত উচ্চমূল্যের ও জরুরি শিল্প কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক পণ্য, ওষুধ ও সংবেদনশীল সরঞ্জাম আমদানি করা হয়। এসব পণ্য নিরাপদে সংরক্ষণ ও দ্রুত খালাস নিশ্চিত না হলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। তাদের দাবি, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত কার্গো শেড দ্রুত চালু, নিরাপদ সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং পুরো কার্গো ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা ছাড়া এ সংকটের সমাধান হবে না।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম বলেন, বৃষ্টিপাত একটি প্রাকৃতিক বিষয়। এছাড়া অনেক আমদানিকারক সময়মতো পণ্য খালাস না করায় কার্গো এলাকায় চাপ তৈরি হয়। কিছু পণ্য খোলা জায়গায় রাখতে হয়। অগ্নিকাণ্ডের পর সিভিল এভিয়েশন ওয়্যারহাউজ আংশিক সংস্কার করেছে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক সদস্য বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত শেড যদি সময়মতো সংস্কার করা হতো এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকত, তাহলে বৃষ্টির অজুহাতে কোটি কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হতো না। অগ্নিকাণ্ডের পর সিভিল এভিয়েশন যেটুকু সংস্কার করেছে সেখানে মাত্র ১০০ টন পণ্য রাখা যায়। অথচ প্রতিদিন প্রায় ৬০০ টন কার্গো আসে। বাকি পণ্য খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছে।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগীব সামাদ যুগান্তরকে বলেন, যে পরিমাণ কার্গো আসছে, সে পরিমাণ পণ্য সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও রিসিপিয়েন্টরা খালাস করছেন না। সে কারণেই জায়গা সংকট হচ্ছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামত করে নতুনভাবে চালু করা সহজ কাজ নয়। আমরা জানি, বর্ষায় বৃষ্টিতে পণ্য ভিজছে। কিন্তু যারা কনসাইনমেন্ট আনছেন তারা দ্রুত পণ্য নিয়ে গেলে এ পরিস্থিতি তৈরি হতো না। তিনি বলেন, আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে, সমাধানের জন্য থার্ড টার্মিনাল চালু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।