স্বল্প মূল্যে উন্নত জাতের হাঁসের বাচ্চা সরবরাহ, বেকারত্ব দূরীকরণ ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখার লক্ষ্য নিয়ে ভোলায় স্থাপন করা হয়েছিল হ্যাচারিসহ আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার। তবে মেশিন ও জেনারেটর নষ্ট এবং জনবল সংকটে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে খামারটির বাচ্চা উৎপাদন কার্যক্রম। এতে ভোলার হাজারো ছোট-বড় হাঁস খামারি পড়েছেন বিপাকে।
খামারিরা বলছেন, সরকারি এই খামার চালু থাকলে কম দামে উন্নত জাতের হাঁসের বাচ্চা পাওয়া যেত। বর্তমানে বাইরে থেকে বেশি দামে বাচ্চা কিনতে হচ্ছে, ফলে অনেকেই বড় পরিসরে খামার করতে পারছেন না।
সরেজমিনে জানা গেছে, খামারিদের স্বল্প মূল্যে উন্নত জাতের হাঁসের বাচ্চা সরবরাহ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর পুষ্টির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে হ্যাচারিসহ আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার প্রকল্পের আওতায় ভোলায় খামারটি স্থাপন করা হয়। ২০১৩ সালের দিকে ভোলা শহরের বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো এখানে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন শুরু হয়।
খামারটি চালু হওয়ায় ভোলার সাত উপজেলার ছোট ও বড় খামারিদের মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়। তবে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৮ সালের জুনে শেষ হওয়ার পর কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে। ২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে বাচ্চা উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০২১ সালে স্বল্প পরিসরে চালু হলেও ২০২৩ সাল থেকে আবার পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে উৎপাদন।
বর্তমানে খামারের বাচ্চা ফোটানোর মেশিন, জেনারেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। হাঁস রাখার ছয়টি সেট থাকলেও বর্তমানে মাত্র দুটি সেটে প্রায় ৪০০ হাঁস রয়েছে। সেট ঘরগুলোর অবস্থাও জরাজীর্ণ।
সদর উপজেলার ভেদুরিয়া ইউনিয়নের ব্যাংকের হাট এলাকার খামারি মো. ছালাউদ্দিন ও নুরুল ইসলাম জানান, তাদের ছোট আকারের হাঁসের খামার রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বড় খামার করার পরিকল্পনা থাকলেও বাচ্চার উচ্চমূল্য ও উন্নত জাতের হাঁস না পাওয়ার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।
তারা বলেন, ভোলার আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার চালু থাকলে কম দামে উন্নত জাতের হাঁসের বাচ্চা কিনে বড় খামার করতে পারতাম।
তারা আরও জানান, হাঁসের ডিম ও মাংসের দাম বেশি থাকায় হাঁসের খামার করে সহজেই লাভবান হওয়া যায়। কিন্তু আমরা সেটা করতে পারছি না।
ভেলুমিয়া ইউনিয়নের খামারি মো. ইসমাইল হোসেন ও আবুল কাসেম জানান, তিন বছরের বেশি সময় ধরে খামারটি বন্ধ রয়েছে। বাধ্য হয়ে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন বাড়ি ও খামার থেকে হাঁসের বাচ্চা কিনতে হচ্ছে। কিন্তু এসব বাচ্চার মৃত্যুহার বেশি হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।
তারা বলেন, গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি ও খামার থেকে ২০টি বাচ্চা কিনলে অনেক সময় টিকে থাকে মাত্র ৪-৫টি। এতে লোকসানের মূখে পড়তে হচ্ছে। সরকারি খামার থেকে উন্নত জাতের বাচ্চা পাওয়া গেলে এমন সমস্যা হতো না।
সদর উপজেলার পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের জংশন এলাকার খামারি মো. ইমরান হোসেন জানান, তিনি হাঁসের খামারের জন্য ঘর তৈরি করলেও বাচ্চার সংকটে খামার চালু করতে পারছেন না।
তিনি বলেন, আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার চালু থাকলে ২৫-৩০ টাকা দামে একটি বাচ্চা পাওয়া যেত। এখন স্থানীয়ভাবে কিনতে গেলে প্রতিটি বাচ্চার দাম ৮০-১০০ টাকা। এত বেশি খরচে খামার শুরু করা কঠিন।
ভোলা আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারটি বন্ধ থাকায় তিনিসহ অনেকে হাঁসের খামার চালু করে বেকারত্ব দূর করতে পারছেন না বলে দাবি করেন তিনি।
ভোলার দক্ষিণ দিঘলদী গ্রামের খামারি মো. নুরুজামান বলেন, ভোলার আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারটি চালু করার পর আমি চরে বড় পরিসরে খামারের দিয়েছিলাম। ভালোই লাভ হতো। কিন্তু বর্তমানে বাজারে হাঁসের বাচ্চার মূল্য বেশি ও উন্নত জাতের বাচ্চা না পাওয়ায় আগের মতো খামার চালাতে পারছি না। হয়ত খামার বন্ধ হয়ে যাবে।
এদিকে খামারের আউটসোর্সিং কর্মচারী মো. সোহাগ হাওলাদার ও মো. রেদয়ান হাসান জানান, বর্তমানে আগের কিছু হাঁসের দেখাশোনা করছেন তারা। তবে খামার বড় পরিসরে চালু থাকলে কাজের পরিমাণ অনেক বেশি থাকত।
ভোলা হ্যাচারিসহ আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারের ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র সহকারী পরিচালক ও সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শাহীন মাহমুদ জানান, খামারে দুটি মেশিনের মাধ্যমে হাঁসের বাচ্চা ফোটানো হতো। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য একটি জেনারেটরও রয়েছে। কিন্তু প্রায় তিন বছর ধরে বাচ্চা ফোটানোর মেশিন ও জেনারেটর নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
তিনি আরও জানান, খামারে রাজস্ব খাতে পাঁচজন এবং আউটসোর্সিংয়ে ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ের মাত্র চারজন কর্মচারী রয়েছেন। রাজস্ব খাতে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই।
শাহীন মাহমুদ বলেন, বিভিন্ন সমস্যার কারণে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সমস্যা সমাধান করে দ্রুত খামারটি চালুর চেষ্টা চলছে।