নিউ জার্সি স্টেডিয়াম বদলে গেল ২০১৪-এর মারাকানায়। ফেরান তোরেস আবির্ভূত হলেন মারিও গোৎসের রূপে। সর্বনাশের মুহূর্তের সময়টায় কেবল হেরফের। বদলি নামা জার্মান গোৎসে আর্জেন্টিনার শিরোপা স্বপ্ন ভেঙে দেন ১১২ মিনিটে। স্প্যানিশ তোরেস সেটা করলেন ১০৬ মিনিটে। হিসাবের বাইরে থেকে দুই সময়ের দুই তরুণ হঠাৎ হয়ে উঠলেন স্বপ্নের হন্তারক। মোহনীয় মেসির জাদুর শেষটা তাই কান্নায়। গোৎসের আঘাত তারপরও সয়েছেন। বয়স ছিল কম। ২০১৮ বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পরও নানা কারণেই টিকে ছিল স্বপ্ন। ২০২২-এ এসে সে স্বপ্ন ধরা দেয়, অবিশ্বাস্য ফুটবলে লক্ষ্যে পৌঁছানোর পর পরম আদরে চুমু এঁকে দেন সোনালি ট্রফিটায়।
সেই অতুলনীয় প্রাপ্তি আরেকবার বিশ্বসেরা হওয়ার ইচ্ছা জাগিয়ে দিয়েছিল। শেষের ইঙ্গিত দিয়েও তাই শেষ রেখাটা টানেননি। সাড়ে তিন বছর আরেকবার জ্বলে ওঠার প্রস্তুত নিয়ে পা রেখেছিলেন এবারের বিশ্বকাপ মঞ্চে। পুরোটা জুড়েই জাদুর পা মুগ্ধতা ছড়াল। গড়লেন একের পর জাদুকরী মুহূর্ত। দলকে নিয়ে এলেন শিরোপার খুব কাছে। তবে এবারের শেষের গল্পটা যে মিলে যাবে মারাকানার সেই দুঃসহ স্মৃতিতে, কল্পনা করেননি নিজেও। তবে এটাই নিষ্ঠুর বাস্তবতা। ফাইনালটা বাদ দিলে মেনে নিতেই হবে ৩৯-এর মেসির পা জোড়ার চাকচিক্য কমেনি একরত্তিও। আগের সাত ম্যাচে বারবার জাদুর বাক্স থেকে একের পর এক বিস্ময় বের করে এনেছেন, করেছেন অসাধারণ আটটি গোল (যার একটিও পেনাল্টি থেকে নয়)। চোখধাঁধানো অ্যাসিস্টে সতীর্থদের তিন গোলে রেখেছেন অবদান। নিজে জ্বলে অন্যদেরও জ্বলতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। একের পর এক বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে সামনে থেকে দলকে দেখিয়েছেন এগিয়ে যাওয়ার পথ।
ফাইনালে তাকে ঘিরেই অসাধারণ কিছুর আশা ছিল আর্জেন্টিনার। তবে স্পেনের নিখুঁত, সুশৃঙ্খল ও কার্যকর ফুটবলের কাছে হার মানতে হয়েছে। ২১ বছর যে ঘরানার ফুটবল খেলে হাজারো কীর্তি গড়েছেন, নিজেকে সর্বকালের সেরা রূপে জানান দিয়েছেন, সেই ঘরানার ফুটবলেই স্প্যানিয়ার্ডরা অকার্যকর করেছে মেসিকে।
জন্ম রোজারিওতে বটে, তবে তিনি সত্যিকারের মেসি হয়ে উঠেছেন স্পেনে। আরও পরিষ্কার করে বললে বার্সেলোনার লা মাসিয়ায়। আর্জেন্টিনা খুঁজে পাওয়ার আগেই যারা তার বাঁ পায়ের প্রতিভার খোঁজ পেয়েছিল। সেই শুরু, এরপর স্প্যানিশ ফুটবলেই বিকশিত হয়ে উঠেছেন সাফল্যের শিখরে। যদিও বিশ্বকাপ আসেনি।
অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন, ২০২১ সালে বার্সেলোনা ছাড়তেই জিতলেন বিশ্বকাপ। চার বছর পর সেই বার্সেলোনা, সেই লা মাসিয়ার একঝাঁক তরুণই তাদের আদর্শকে থামিয়ে দিলেন ফাইনালের মঞ্চে। কাজটা লামিন ইয়ামালদের সহজ হয় আর্জেন্টিনার অক্ষমতায়। স্পেনের চিরায়ত পাসিং ফুটবল মোকাবিলার প্রস্তুতি ছিল না দলটির। অন্তত ফাইনালে তাদের দেখে একবারও মনে হয়নি মেসিতে জোটবদ্ধ হয়ে আগের ম্যাচগুলোতে অসাধারণ সব কীর্তি গড়েছিলেন তারা। আসল মঞ্চে তাদের পায়ে ফোটেনি ফুটবলের ফুল। বরং অসুন্দর ফুটবলে স্প্যানিশ সৌন্দর্য থামানোর চেষ্টায় তারা পুরোপুরি ব্যর্থ।
এ বিশ্বকাপে মেসি নিজের খেলার ধরন বদলেছিলেন আরও কার্যকর হয়ে উঠতে। বিস্ময়কর ড্রিবলিং প্রবণতাকে সংবরণ করে দূর থেকে নিখুঁত ও চোখধাঁধানো শটে প্রতিপক্ষের জাল খুঁজে নেওয়া এবং সতীর্থদের গোল সাজিয়ে দেওয়ায় মনোযোগী ছিলেন।
অন্যদের কাছে বদলে যাওয়া মেসির রহস্য উন্মোচিত না হলেও স্পেন ঠিকই ধরে ফেলে এবং সেভাবেই কৌশল সাজায়। সতীর্থরা আগের ম্যাচগুলোতে বল ঠিকঠাক তুলে দিয়েছিলেন মেসির পায়ে। যা পেয়ে হয় নিজে গোলের চেষ্টা করেছেন; নয়তো সতীর্থদের এমন সব বল বাড়িয়েছেন, যা প্রতিপক্ষকে বারবার বিভ্রান্ত করেছে। ফাইনালে স্পেনের মিডফিল্ডাররা সন্তর্পণে মেসির কাছে বল পৌঁছানোর পথটাই আটকে দিয়েছেন নিখুঁতভাবে। তারা বুঝেছে— মেসিকে অকার্যকর করা মানেই এই আর্জেন্টিনা বড্ড সাদামাটা।
রেফারির শেষের বাঁশি থমকে দিয়েছিল মেসিকে। আবেগটা তখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণেই ছিল। তবে ভীষণ অনিচ্ছায় রুপোর পদক নিয়ে পুরস্কার মঞ্চ থেকে থামার সময় নিউ জার্সির পুরো গ্যালারি যখন মেসি ধ্বনিতে প্রকম্পিত, আকাশ কাঁপানো সেই ধ্বনি কানে আসতেই আর নিজেকে আটকে রাখতে পারেননি। ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন পায়ের জাদুতে দুই দশক গোটা দুনিয়াকে বুঁদ করে রাখা মানুষটি।
দিন যত যাবে, ফাইনালের ব্যর্থতার কাটাছেঁড়া আরও হবে। তবে এ ম্যাচটাকে একপাশে রেখে পুরো যাত্রাপথে মেসি যে হৃদয়ছোঁয়া আনন্দের মুহূর্তগুলো উপহার দিয়েছেন, সেটা কি কেউ কেড়ে নিতে পারবে?
অসীম বীরত্ব, অসংখ্য মহাকাব্যিক মুহূর্ত আর একের পর এক অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখার পরও বিশ্বকাপটা হয়তো হাতছাড়া হয়েছে, তবে মেসি নিজেকে নিয়ে গেছেন শিখরে। সেই উচ্চতায়, যেখানে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব।