২০২৪ সালে স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। রোববার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ জানায় এইচআরডব্লিউ। বিবৃতিতে গুম প্রতিরোধে নেওয়া সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১২ জুলাই দেয়া হাইকোর্টের নির্দেশ দ্রুত বাস্তবায়ন করে ৩০ বছর বয়সী মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ তদন্ত করা প্রয়োজন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সর্বশেষ তাকে কোস্ট গার্ডের হেফাজতে দেখা গিয়েছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৪ সালে গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া শেখ হাসিনার সরকারের সময় জোরপূর্বক গুম ব্যাপক মানবাধিকার সংকটে পরিণত হয়েছিল। এ প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করে। ওই অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতা এবং আদালতের অনুমতি ছাড়াই যেকোনো আটককেন্দ্র পরিদর্শনের অধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল।
তবে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার অধ্যাদেশটি নবায়ন বা স্থায়ী আইনে রূপ দেয়নি। ফলে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারিয়েছে। সরকার নতুন একটি আইন প্রস্তাব করেছে, যাতে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা মানবাধিকার কমিশনের কাছ থেকে প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজারো মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন। সাম্প্রতিক ঘটনাটি প্রমাণ করে, কার্যকর সংস্কার না হলে এ ধরনের ঘটনা আবারো ঘটতে পারে। নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে এ ধরনের অপকর্ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া নতুন সরকারের উচিত যথাযথ সুরক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।’
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা তাদের নির্দেশে পরিচালিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে কাউকে আটক বা অপহরণের পর তার আটকের বিষয়টি অস্বীকার করা কিংবা তার অবস্থান গোপন রাখাকে জোরপূর্বক গুম হিসেবে গণ্য করা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার জোরপূর্বক গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষা বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগ দেয়। ওই কনভেনশন অনুযায়ী, গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, তদন্ত করা এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এইচআরডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১০ এপ্রিল রাতে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী সুন্দরবনের কাছে মোংলার জয়মণির ঘোল এলাকায় জেলে মিরাজ শেখকে কোস্ট গার্ডের সদস্যরা আটক করে একটি স্পিডবোটে তুলে যেতে দেখেছেন।
পরদিন মিরাজের পরিবারের সদস্যরা মোংলার দিগরাজে কোস্ট গার্ড কার্যালয়ে গেলে প্রথমে তাদের জানানো হয়, ‘মিরাজ একটি অভিযানে’ রয়েছেন এবং বিকেলে আসতে বলা হয়। পরে গেলে কর্তৃপক্ষ জানায়, মিরাজ কখনোই সেখানে ছিলেন না।
২১ এপ্রিল যে চায়ের দোকানের সামনে থেকে মিরাজকে আটক করা হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেই দোকানের মালিক জানান, নিজেকে কোস্ট গার্ড সদস্য পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি এসে মিরাজের রেখে যাওয়া মোটরসাইকেল নিয়ে যান। পরদিন কোস্ট গার্ড সদস্যরা সেটি আবার ফিরিয়ে দেন।
মিরাজের পরিবারের আইনজীবী মুজাহেদুল ইসলাম শাহীন এইচআরডব্লিউকে বলেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীরা কীভাবে এবং কখন তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, কোস্ট গার্ডের সদস্যরাই তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন।’
মিরাজের পরিবার অভিযোগ দায়ের, সংবাদ সম্মেলন এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করলেও কোনো সুরাহা পায়নি। পরে তার বাবা হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস আবেদন করলে গত ১২ জুলাই আদালত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ১৫ দিনের মধ্যে মিরাজকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে, কোস্ট গার্ডের পশ্চিম জোনের গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন বারবার দাবি করেছেন, মিরাজকে কোস্ট গার্ড আটক করেনি এবং তার সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
এইচআরডব্লিউ বলছে, ঘটনাটি অতীতের গুমের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত তদন্ত কমিশনের হিসাবে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অন্তত ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ২৮২ জন কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত গোপন কোনও স্থানে আটকে থাকার পর ফিরে আসেন। কমপক্ষে ২৫১ জন আর কখনও ফিরে আসেননি এবং তাদের মৃত বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া আরও ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কমিশনের মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গোপন আটককেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক ও পরিকল্পিত নির্যাতনের আলামত পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে আলোচিত গুমের ঘটনাগুলোর একটি হলো ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম (আরমান)-এর ঘটনা। ২০১৬ সালের আগস্টে র্যাব সদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে যায় এবং টানা আট বছর বন্দি রাখা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির পর তিনি বলেন, ‘আট বছর সূর্যের আলো দেখিনি। মনে হতো, যেন আমাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে।’
আরমানের গুমের ঘটনাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলোর একটি। এ মামলায় র্যাবে দায়িত্ব পালন করা সেনাবাহিনীর ১০ জন কর্মরত কর্মকর্তাও আসামি।
এইচআরডব্লিউ জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৫ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ এবং জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এ দুটি অধ্যাদেশ কার্যকর থাকলে গুমের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত এবং প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সুযোগ থাকত।
কিন্তু নবনির্বাচিত সরকার এসব অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হতে দেয়। নতুন প্রস্তাবিত আইনে গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের হাতেই রাখা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশন কেবল সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রধান বা সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। পাশাপাশি কমিশনের সদস্য নিয়োগ ও বিধিমালা প্রণয়নে সরকারের প্রভাব বাড়ানোরও প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানায় এইচআরডব্লিউ ।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘সরকারের উচিত প্রস্তাবিত আইন সংশোধন করে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং জোরপূর্বক গুমের ঘটনা তদন্তের ক্ষমতা পুনর্বহাল করা। পুলিশের ওপরই তদন্তের দায়িত্ব রেখে দিলে প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ বন্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধও তৈরি হবে না।’