প্রতি বছর সারা দেশের প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বিতরণের জন্য পাঠ্যবই ছাপিয়ে থাকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। কতগুলো বই বিতরণের জন্য মুদ্রণ করা হবে সেই তথ্য দেশের সব উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে সংগ্রহ করা হয়। অতিরিক্ত চাহিদা বন্ধে মাঠ পর্যায়ের তথ্যও যাচাই করে এনসিটিবি। এরপরও প্রতিষ্ঠানটি অতিরিক্ত বই ছাপিয়েছে। যার ফলে সরকারের ৫১৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
সম্প্রতি এনসিটিবির ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। নিরীক্ষায় চাহিদাপত্র, কার্যাদেশ, সিসিজিপি (CCGP) ও হোপ (HOPE) কর্তৃক অনুমোদিত মূল্যায়ন প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে এ অনিয়মের তথ্য পেয়েছে শিক্ষা অডিট।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক, এসএসসি, ভোকেশনাল, ইবতেদায়ী, দাখিল, দাখিল ভোকেশনাল এবং রেইল স্তরের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহসংক্রান্ত মোট ৭৪১টি লটের মূল্যায়ন প্রতিবেদন পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, ৭৪১টি লটের বিপরীতে ৩০ কোটি ৮৯ লাখ ৪৩ হাজার ২৯টি বই সরবরাহের জন্য বিভিন্ন সরবরাহকারীকে ১ হাজার ৮৬২ কোটি ৩৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৪ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কাজ সমাপ্তির সনদ অনুযায়ী ৩০ কোটি ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৬৯২টি বইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়।
কিন্তু নিরীক্ষায় দেখা যায়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকৃত চাহিদা ছিল ২১ কোটি ৯৭ লাখ ৪০ হাজার ৬১১টি বই। অন্যদিকে, বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনায় (এপিপি) বইয়ের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় ২৪ কোটি ৪৮ লাখ ৮ হাজার ২৩৮টি।
আমি নতুন এসেছি। এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন এখনো পাইনি। এ ছাড়া বিষয়টি জানাও নেই। আমাদের সচিব প্রশাসনিক বিষয়গুলো দেখভাল করেন।—আজীজ হায়দার ভূইয়া, সদস্য (অর্থ), এনসিটিবি
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ২০২৪ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত এপিপি-সংক্রান্ত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পিপিআর-২০০৮ অনুসারে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের অনুমোদনক্রমে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে মুদ্রণযোগ্য বইয়ের সংখ্যা নির্ধারণ করার কথা ছিল। একই সঙ্গে পিপিএ-২০০৬ ও পিপিআর-২০০৮ অনুযায়ী সকল ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার নির্দেশনা ছিল।
কিন্তু এনসিটিবি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোর প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে এপিপি প্রণয়ন না করে অতিরিক্ত বই মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের কার্যাদেশ দেয়। এর ফলে সরকারের ৫১৬ কোটি ৩৪ লাখ ৪১ হাজার ২১১ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অনিয়মের কারণ হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৭ মার্চ ২০২৪ তারিখের সভার সিদ্ধান্ত এবং পিপিএ-২০০৬ ও পিপিআর-২০০৮-এর বিধান লঙ্ঘনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে নিরীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান এনসিটিবির কাছে ব্যাখ্যা চাইলেও সংস্থাটি কোনো জবাব দেয়নি। নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষের মতে, জবাব প্রদান থেকে বিরত থাকায় অডিট কোডের বিধি ৫৯ এবং ট্রেজারি রুলসের অধীনে প্রণীত সাবসিডিয়ারি রুলসের বিধি ৪৩৭ লঙ্ঘিত হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে চাহিদার অতিরিক্ত বই ক্রয়ের ফলে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা ক্রয় কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিটিবি সদস্য (অর্থ) আজীজ হায়দার ভূইয়া দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন এখনো পাইনি। এ ছাড়া বিষয়টি জানাও নেই। আমাদের সচিব প্রশাসনিক বিষয়গুলো দেখভাল করেন। তার সাথে কথা বলে দেখতে পারেন।’
এনসিটিবি সচিব প্রফেসর শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো প্রতিবেদনটি পাইনি। প্রতিবেদন পেলে সংশ্লিষ্ট শাখায় সেটি পাঠানো হবে। এরপর বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বলতে পারব।’
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে এনসিটিবি চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।