ভারতের কর্ণাটকের ধরওয়াড়ে একটি ফ্ল্যাট থেকে এক চিকিৎসকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই ফ্ল্যাটে ছুরিকাঘাতে আহত অবস্থায় পাওয়া গেছে তার আট বছর বয়সী ছেলেকে। তবে ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে চিকিৎসক স্ত্রীর আচরণ। স্বামী ও সন্তানের রক্তাক্ত দেহের পাশে বসে তাকে মোবাইল ফোন স্ক্রল করতে দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) কর্ণাটক পুলিশের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ইন্ডিয়া টুডে।
নিহত চিকিৎসকের নাম ডা. কিরণ হোনান্নাভার (৪৫)। তিনি ধরওয়াড়ের চিরায়ু হাসপাতালে অ্যানেসথেটিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা কাট্টানাহাল্লিও একজন চিকিৎসক। তিনি এমবিবিএসের পর চক্ষুবিদ্যায় এমএস ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
পুলিশ জানায়, কিরণ স্ত্রী ও আট বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে ধরওয়াড়ের পবন হাই স্কুলের বিপরীতে একটি অভিজাত আবাসিক ভবনের ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন। তাদের পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত ওই বাসায় যাতায়াত করতেন।
গত মঙ্গলবার রাত থেকে কিরণের স্বজন ও বন্ধুরা তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। তবে তিনি ফোন ধরছিলেন না। প্রতিবারই ফোন ধরছিলেন তার স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা। প্রথমে তিনি স্বজনদের বলেন, তার স্বামী বিশ্রাম নিচ্ছেন। পরদিন সকালে জানান, কিরণ ডিউটির জন্য বাইরে গেছেন।
প্রতিবেশীরাও কিরণের খোঁজ নিতে ওই ফ্ল্যাটে যান। তবে প্রিয়াঙ্কা দরজা না খুলে ভেতর থেকে জানান, তার স্বামী বাসায় নেই। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কিরণের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় স্বজনদের সন্দেহ হয়। তারা ফ্ল্যাটে গিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে হুব্বাল্লি-ধরওয়াড়ের পুলিশ কমিশনার এন শশীকুমার একটি বিশেষ দল নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। পরে পুলিশ দরজা ভেঙে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে।
পুলিশ জানায়, ঘরের ভেতর রক্তের দাগ ছিল। একটি কক্ষে ডা. কিরণের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে ছিল। তার শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। অন্য একটি কক্ষে তার ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। শিশুটির শরীরেও ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল।
প্রথমে শিশুটিকে মৃত মনে করা হলেও পুলিশ কমিশনার লক্ষ্য করেন, তার বুক ওঠানামা করছে। সে তখনো শ্বাস নিচ্ছিল। পরে দ্রুত তাকে উদ্ধার করে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
পুলিশ ও স্বজনদের সবচেয়ে বেশি স্তম্ভিত করেছে প্রিয়াঙ্কার আচরণ। স্বামী ও সন্তানের রক্তাক্ত দেহের পাশে খাটে শুয়ে তাকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেখা যায়। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করছিলেন।
পুলিশ কমিশনার এন শশীকুমার বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ফ্ল্যাটে জোর করে প্রবেশের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ঘটনার সময় ওই ফ্ল্যাটে স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান ছাড়া অন্য কারও উপস্থিতির প্রমাণও মেলেনি। ফলে ঘটনার সঙ্গে বাইরের কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততার প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
পুলিশ কমিশনার বলেন, ঘটনার সময় এবং কী কারণে হামলা হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রিয়াঙ্কা কার সঙ্গে কথা বলেছেন, কী বলেছেন এবং ফ্ল্যাটের ভেতরে ঘটনাগুলো কীভাবে ঘটেছে এসবও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে প্রিয়াঙ্কা নিজেকে মানসিক ট্রমা বা শকের মধ্যে আছেন বলে দাবি করেছেন। তিনি অসংলগ্ন কথাবার্তাও বলেছেন। তার দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অবসাদের ওষুধ খাচ্ছেন। ঘটনার পর কী করবেন বুঝতে না পেরে চুপচাপ বসেছিলেন। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। পারিবারিক কোনো বিরোধ ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করছে পুলিশ।
ঘটনার প্রকৃত কারণ ও ধারাবাহিকতা জানতে পুরো ফ্ল্যাটের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার ফোনের তথ্য ও যোগাযোগের বিষয়ও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।