জুলাই আন্দোলনের সময় বাংলাদেশ পুলিশ ৭ পয়েন্ট ৬২ মিলিমিটার রাইফেলের মতো ‘ব্যাটল রাইফেল’ ব্যবহার করে।
যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার উপযোগী এ ধরনের মারণাস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার অনেক শিক্ষার্থী ও নাগরিকের জীবন কেড়ে নেয়। নাগরিকদের এমন জীবনহানিতে পুলিশের ভূমিকা ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৪ সালের পর থেকে রাজনৈতিক আন্দোলন দমনে পুলিশকে ক্রমান্বয়ে যেভাবে সামরিকীকরণ করা হয়েছিল, জুলাই অভ্যুত্থানে তারই চরম বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়।
আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাটল রাইফেল ব্যবহারের প্রাণঘাতী একটি অধ্যায় ছিল রাজধানীর যাত্রাবাড়ী। ২০২৪ সালের ১৯ থেকে ২১ জুলাই—তিনদিনে যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনকারীদের দমাতে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪৯৫ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয় ৭ পয়েন্ট ৬২ এমএম চায়না রাইফেল থেকে। এতে শতাধিক প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার উপযোগী অত্যাধুনিক এ মারণাস্ত্র দিয়ে প্রতি মিনিটে ৩০-৪০ রাউন্ড গুলি চালানো যায়। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে পুলিশ বাহিনীর জন্য ১৮ হাজার ৭ পয়েন্ট ৬২ মিমি রাইফেল আমদানি করা হয়। ২০২৪ সালের ২ মে জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘পুলিশকে স্মার্ট বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের যুগোপযোগী আগ্নেয়াস্ত্র দেয়া হচ্ছে। পয়েন্ট ৩০৩ রাইফেলের পরিবর্তে এখন ৭ পয়েন্ট ৬২ মিলিমিটার রাইফেল ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুলিশ বাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডারে ব্যাটল রাইফেলের মতো উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আগ্নেয়াস্ত্র থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার কঠোর নীতিমালার আওতায় সীমিত বলে জানিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। সাধারণত জিম্মি উদ্ধার, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বিশেষ অভিযানে বিশেষায়িত ইউনিট এসব অস্ত্র ব্যবহার করে। জাতিসংঘের অস্ত্র ব্যবহার নীতিমালায়ও সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নীতি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তদন্তে অভিযোগ ওঠে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে পুলিশ সদস্যদের হাতে ব্যাটল রাইফেল ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দেখা যাওয়ায় বাহিনীর বলপ্রয়োগের নীতি ও প্রশিক্ষণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। বাংলাদেশ পুলিশে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রের অন্তর্ভুক্তি ঘটে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের আমলে। ২০১৪ সাল এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক আন্দোলন দমাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর যুক্তিতে এসব অস্ত্র সংগ্রহ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে উগ্রবাদবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলন মোকাবেলায়ও এমন অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো হয়। ২০১৪ সালে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর পুলিশের আধুনিকায়নের নামে বাহিনীতে যুক্ত করা হয় ৭ পয়েন্ট ৬২ এমএম চায়না রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, বিডি-৮ অ্যাসল্ট রাইফেল, টরাস ৯ এমএমের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার্য অস্ত্র।
পুলিশের হাতে এ ধরনের অস্ত্র তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ২০১৪ সালের ২৬ অক্টোবর। এক সভায় পুলিশের পক্ষে অংশ নেন তৎকালীন এআইজি মো. হারুন অর রশিদ। সভায় বাহিনীতে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এ পুলিশ কর্মকর্তা। ২০১৫ সালে প্রথম দফায় ইতালি থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গুলি আমদানি করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন দেশ থেকে আনা হয় আরো অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ও গুলি। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দরপত্রের মাধ্যমে পুলিশের কাছে থাকা ৭ পয়েন্ট ৬২ এমএম রাইফেলের জন্য কাভার কেনা হয়। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ ২ কোটি ৪৯ লাখ পিস প্রাণঘাতী গুলি কেনে। অন্যদিকে একই সময়ে টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেটের মতো সরঞ্জাম কেনা হয় ৩০ লাখ ইউনিট।
জুলাই আন্দোলনে বিভিন্ন ঘটনায় হওয়া মামলার এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনী রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, কদমতলী, রামপুরা, ধানমন্ডি ও চট্টগ্রামের চান্দগাঁও এলাকায় ছাত্র আন্দোলন দ্রুত সময়ে দমাতে স্পেশাল পারপাস অটোমেটিক শটগান (স্পার্স), ৭ পয়েন্ট ৬২ এমএম চায়না রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, বিডি-৮ অ্যাসল্ট রাইফেল, টরাস ৯ এমএম ও ৯ পয়েন্ট ১৯ এমএম সিজে পিস্তল থেকে ১৭ হাজার ২৯ রাউন্ড বুলেট ছুড়েছে।
প্রাণঘাতী এসব অস্ত্র ব্যবহার করে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে ১ হাজার ৫৬৩ রাউন্ড, মোহাম্মদপুরে ২৯৮ ও সিসা বুলেট ২ হাজার ৯৮৪ রাউন্ড, উত্তরায় ৩৯০, ধানমন্ডিতে ৩৩৭ ও শাহবাগে ৪৩ রাউন্ড বুলেট ছোড়া হয়। যেসব স্পটে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয় তার মধ্যে যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা অন্যতম।
জুলাই আন্দোলনে ব্যাটল রাইফেল ও সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে যেভাবে মাঠে নামানো হয়েছিল, সেটিই জনগণের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় জনসমাবেশ বা আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে ধাপে ধাপে বলপ্রয়োগের নীতি অনুসরণ করা হয়। কিন্তু এসব ধাপ অনুসরণ না করে সরাসরি প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তোলে —ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক উপদেষ্টা
জুলাই আন্দোলনে ব্যাপক হারে ব্যাটল রাইফেল ব্যবহারের অভিযোগের পর পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা, পেশাদারত্ব, বলপ্রয়োগের নীতি ও জবাবদিহি নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়।
ব্যাটল রাইফেলের ব্যবহার জনগণের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব তৈরি করেছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে ব্যাটল রাইফেল ও সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে পুলিশকে যেভাবে মাঠে নামানো হয়েছিল, সেটিই জনগণের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে জনসমাবেশ বা আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে ধাপে ধাপে বলপ্রয়োগের নীতি অনুসরণ করা হয়। প্রথমে সতর্কবার্তা, এরপর জলকামান, টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড বা সীমিত লাঠিচার্জের মতো কম প্রাণঘাতী পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এসব ধাপ অনুসরণ না করে সরাসরি প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তোলে।’
তিনি আরো বলেন, ‘দুর্গম বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশের কাছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র থাকতে পারে। তবে সেই অস্ত্র সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নয়। আইনও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের কথা বলেছে।’
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, জুলাই আন্দোলন দমনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের পর্যবেক্ষণে বলপ্রয়োগের বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার ও বলপ্রয়োগসংক্রান্ত নীতিমালা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্বিন্যাস করা না হলে পুলিশের প্রতি জনআস্থা মজবুত করা কঠিন হবে।
আইন পুলিশকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতা দিলেও তা সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে প্রয়োগের জন্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অতীতে দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক আন্দোলন মোকাবেলায় পুলিশকে যেভাবে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে। জুলাই আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাটল রাইফেলসহ প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে পুলিশের বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছিল। আইন পুলিশকে নির্দিষ্ট ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতা দিয়েছে, তবে সেই ক্ষমতা কখনই নির্বিচারে বা সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে প্রয়োগের জন্য নয়। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আইনসম্মত বলপ্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনাও জরুরি।’
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করেন, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পুলিশ সদস্যকে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। এজন্য দেশে সুনির্দিষ্ট বিধি রয়েছে।
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। যেমন—পুলিশ সদস্যের নিজের জীবন, সাধারণ মানুষের জীবন বা জনসম্পদের ওপর তাৎক্ষণিক ও গুরুতর হুমকি তৈরি হলে প্রয়োজনীয় সীমার মধ্যে বলপ্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে অস্ত্র ব্যবহারের আগে পরিস্থিতির প্রকৃতি, হুমকির মাত্রা এবং বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে কিনা—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে বিবেচনায় নিতে হয়। কোনো পরিস্থিতিতেই নির্বিচারে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ আইন ও পেশাগত নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
সাবেক এ আইজিপি মনে করেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তাকে তার বিবেচনাবোধও ব্যবহার করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রতিটি পুলিশ সদস্যের পেশাগত ও আইনি দায়িত্ব রয়েছে। কোনো নির্দেশ যদি অযৌক্তিক, অপ্রয়োজনীয় বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলপ্রয়োগের দিকে নিয়ে যায়, তাহলে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আইনসম্মত বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে গণআন্দোলনের মতো পরিস্থিতিতে পুলিশের প্রধান দায়িত্ব জনগণের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়ানো নয়। পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে বলপ্রয়োগের প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং আইনানুগ জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।’