Image description

ঢাকা কলেজ থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স পাস করে দুই বছর বেকার ছিলেন এক তরুণ। সম্প্রতি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছেন। বেকারত্ব ঘোঁচার কারণে শুরুতে বেশ তৃপ্ত ছিলেন। কিন্তু এখন অফিস তার কাছে যন্ত্রণার মনে হয়।

এই যন্ত্রণার কারণ: মাস শেষে বেতন মাত্র ১৫ হাজার টাকা। কাজ করতে হয় ১০ ঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটিও একদিন।

টাইমস অব বাংলাদেশকে এই তরুণ বলেন, ‘বাংলাদেশে জন্ম নেওয়াটাই যেন পাপ। অফিসে ভালো পোশাক পরে যেতে বলে, কিন্তু টাকা কোত্থেকে আসবে ভাবে না। রিকশা চালকও আমার চেয়ে বেশি আয় করেন। যে সবজি বিক্রেতা স্যার বলে আমাকে সম্পদশালী ভাবেন, আমার আয় হয়ত তার চার ভাগের এক ভাগও না।’

 

তরুণদের কর্মসংস্থানের যে সংকট, সেই আলোচনায় যাদের কর্মসংস্থান আছে, তা মানসম্মত কিনা সে আলোচনা সেভাবে উঠে না। অথচ যারা বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিতে যোগ দেন, তারাও যে মাস শেষে হতাশ থাকেন, সেটি স্পষ্ট।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যার ব্যুরোর (বিবিএস) অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ কোটি ১৭ লাখের বেশি অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে, যা ২০১৩ সালের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে ৩ কোটিরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

 

সরকারি চাকরির যে বেতন কাঠামো, সেটি যুগের সঙ্গে মাননসই নয় বলে নতুন পে স্কেল দেওয়া হচ্ছে। অথচ বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য পদক্ষেপ কী হবে, তা আলোচনায় নেই। বেসরকারি খাতে ব্যাংক, বহুজাতিক এবং দেশীয় অল্প কিছু কোম্পানিতে তুলনামূলক ভালো বেতন পাওয়া যায়। তবে এর বাইরে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে নতুনদের বেতন ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। এ কারণে চাকরিতে যোগ দিয়েও তরুণরা মনোবেদনায় ভুগেন।

মানসম্মত চাকরির জন্য কি নীতিমালা প্রয়োজন?

বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নীতিমালা করা উচিৎ কিনা, এই প্রশ্নে বাংলাদেশের বৃহত্তম অনলাইন চাকরির প্ল্যাটফর্ম বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি চাকরির স্থায়িত্ব, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মপরিবেশ এবং শ্রম অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শিক্ষিত বেকারত্বের সমাধান শুধু চাকরির সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রয়োজন মানসম্মত ও টেকসই কর্মসংস্থান।’

সরকারি চাকরিতে নিয়োগ, পদোন্নতি, ছুটি, অবসর ও অন্যান্য সুবিধা আইন ও বিধিমালার মাধ্যমে নির্ধারিত। জাতীয় বেতন স্কেল, পেনশন ও অন্যান্য সুবিধার কারণে সরকারি চাকরি এখনো অধিকাংশ তরুণের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র।

অন্যদিকে বেসরকারি খাতে শ্রম আইন থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন ও চাকরির নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন। ফলে চাকরির সংখ্যা বাড়লেও সব ক্ষেত্রে তা মানসম্মত কর্মসংস্থানে পরিণত হয় না।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক ওয়ারেসুল করিম টাইমসকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা মুনাফা করতে চায়। কিন্তু বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ সুদ, মূল্যস্ফীতি ও ব্যবসার বাড়তি খরচের চাপে রয়েছে। ফলে তাদের ভালো বেতন দেওয়ার সক্ষমতাও দেখতে হবে।’

তার মতে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অবস্থা ভালো হলে, সুদের হার কমলে ব্যবসায়ীরাও ভালো মুনাফা করতে পারবে। তখন কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকেও ভালো বেতন দিতে পারবে।

ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘বেসরকারি খাতের জন্য অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালা সব সময় কার্যকর নাও হতে পারে। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় বেসরকারি খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।’

তরুণরা কি পর্যাপ্ত দক্ষ?

এ এক বিপরীতমুখী সমস্যা। তরুণরা যেমন চাকরির জন্য হন্যে, সেখানে নিয়োগদাতারা প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল না পাওয়ার অভিযোগ করছেন।

ফাহিম মাশরুর বলেন, সমস্যাটি একমাত্রিক নয়। একদিকে মানসম্মত চাকরির ঘাটতি রয়েছে, অন্যদিকে শিক্ষা ব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং শিল্পখাতের চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও রয়েছে। ফলে অনেক গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও নিয়োগদাতাদের প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করতে পারেন না।

বাংলাদেশে বহু বছর ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাতের অংশীদারত্ব, ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা,

কারিগরি ও সফট স্কিল প্রশিক্ষণ, শ্রমবাজারের তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির নীতিগত উদ্যোগ নিয়ে কথা হচ্ছে। তবে এসব নিয়ে বড় আকারে সরকারের উদ্যোগ নেই।

বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছে। আবার আগামী অর্থবছরের বাজেটে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হয়েছে। অথচ দেশে এখনো এমন শিক্ষা অবকাঠামো নেই।

ওয়ারেসুল করিম মনে করেন, বেকারত্বের পেছনে শুধু দক্ষতার ঘাটতি নয়, অর্থনীতির সামগ্রিক কাঠামোগত সমস্যাও দায়ী। তার মতে, দেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে প্রথমে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো, ঋণের উচ্চ সুদের হার নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

বিকল্প কি উদ্যোক্তা হওয়া?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের স্নাতক মেহরাব হোসাইন প্রায় এক বছর সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার পর ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় ছোট পরিসরে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেছেন। তবে ব্যবসায় নামার পর বুঝতে পারেন ক্যালকুলেটরে মুনাফা গোনার হিসাব বাস্তবে মেলে না।

টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘উদ্যোক্তা হওয়া বলা যত সহজ, বাস্তবে ততটা নয়। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন তরুণের জন্য টাকা মূলধন জোগাড় করাও কঠিন। ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সুযোগও সীমিত।’

বিবিএসের অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ এ অংশ নেওয়া ৮৬ শতাংশ উদ্যোক্তা মূলধনের সংকটকে ব্যবসার সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ফাহিম মাশরুর টাইমসকে বলেন, ‘সবাই উদ্যোক্তা হতে পারে না। আর উদ্যোক্তা হওয়াকেই বেকারত্ব সমস্যার একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক নয়।”

তিনি বলেন, একটি অর্থনীতিতে উদ্যোক্তার পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, বিপণনকর্মী ও প্রযুক্তি পেশাজীবীরও প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি মনে করেন, সরকার চাইলে শিক্ষা ও সামাজিক খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সম্মানজনক বেতন নিশ্চিত করা গেলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে।

 বাজেটে কি সংকটের প্রতিফলন আছে?

বিবিএস-এর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ ৩০ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক, যা মোট বেকারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও দীর্ঘ সময় চাকরি না পাওয়ার বাস্তবতা অনেক তরুণকে নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য করছে।

অবশ্য বেকারত্বের এই বৈশ্বিক সংজ্ঞা আর দেশের বাস্তবতা ভিন্ন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও বলছে, ১৫ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী কেউ বিগত সপ্তাহে মজুরি বা মুনাফার বিনিময়ে এক ঘণ্টার জন্যও কোনো কাজ করেননি, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কাজ শুরু করার জন্য প্রস্তুত এবং গত চার সপ্তাহের মধ্যে সক্রিয়ভাবে কাজের সন্ধান করেছেন, তারাই বেকার। বাংলাদেশও একই সংজ্ঞা মেনে বেকারত্বের হিসাব করে।

তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় সপ্তাহে এক ঘণ্টা আয়বর্ধক কাজ করে হাতখরচই ওঠে না।

অর্থনীতির শিক্ষক ওয়ারেসুল করিম বলেন, ‘দেশে বেকার যদি ২৬ লাখই হয় তবে সরকার কেন এক কোটি কর্মসংস্থানের কথা বলছে?’

নতুন বাজেটেও কর্মসংস্থানমুখী, শিল্পায়ন-নির্ভর ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গঠনের কথা বলা হয়েছে। যুবসমাজকে উদ্যোক্তাপ্রবণ ও কর্মমুখী করতে স্টার্টআপ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এবার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় আড়াই শতাংশ। পাশাপাশি ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল গঠন এবং তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।

ওয়ারেসুল করিম বলেন, ‘বাজেটে শিক্ষা খাত সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেলেও কর্মসংস্থানের সঙ্গে এর সরাসরি সংযোগ কতটা তৈরি হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। শুধু বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না; সেই অর্থ কিভাবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ব্যবহার হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।’

নতুন ভয় এআই

কর্মসংস্থানের চলমান এই সংকটের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারণে চাকরির বাজার দ্রুত বদলে যাওয়ায় আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে চাকরি না পাওয়ার, এমনকি ফ্রি ল্যান্সার হিসেবে কাজ না পাওয়ারও তথ্য মিলেছে। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানাও চাকরি সংকুচিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ফাহিম মাশরুরের মতে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি দক্ষতা ও ছোট উদ্যোগের দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই শিক্ষার্থীদের বিকল্প দক্ষতা অর্জনে মনোযোগী হওয়া উচিত। ড্রাইভিং, রান্না, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা অন্যান্য ব্যবহারিক দক্ষতা একজন তরুণকে বেকারত্বের ঝুঁকি থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।’