Image description

জালিম শাসকের লেলিয়ে দেওয়া খুনি বাহিনীর সামনে আবু সাঈদের বীরের মতো জীবন উৎসর্গ করার দৃশ্য মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদের এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে ওইদিনই লেখা হয়ে যায় শেখ হাসিনার সরকারের মৃত্যু পরোয়ানা। আবু সাঈদকে হত্যার এই দৃশ্য ফ্যাসিবাদের অন্ধ সমর্থক ছাড়া দেশের সব মানুষের মনে গভীর দাগ কাটে। তাদের মনে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। মানুষের মন থেকে মুহূর্তে যেন মৃত্যুভয় উধাও হয়ে যায়। পরের দিন থেকে নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধা থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসতে থাকেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির মতো। কোটা সংস্কার আন্দোলন দ্রুত রূপ নিতে থাকে সরকার পতনের এক দফায়। ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনীসহ সব নিরাপত্তা বাহিনী, অস্ত্রসহ দলীয় বাহিনীকে নামিয়েও আর পতন ঠেকানো সম্ভব হয়নি মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনার পক্ষে।

 

২০২৪ সালের ১১ জুলাই চীন থেকে অপমানিত হয়ে দেশে ফেরেন ভারতের তাঁবেদার শেখ হাসিনা। ১৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন । এক প্রশ্নের জবাবে হাসিনা বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা কোটা না পেলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা চাকরি পাবে? এর প্রতিবাদে ওইদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাবির রাতের ক্যাম্পাস। পরের দিন সকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে শেখ হাসিনার রাজাকার-সংক্রান্ত বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রলীগ, তাদের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী ও বহিরাগত অছাত্ররা ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ ঘটনায় অনেকে আহত হন। এ হামলার ঘটনার খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের গন্ডি পেরিয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন শহরে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব নামকরা কলেজসহ অনেক স্কুলের শিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমে আসেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন দেশের তরুণ সমাজসহ অনেকে। ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার,’ ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ বিভিন্ন স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথসহ সারা দেশের বিভিন্ন শহর-বন্দর। বেসামাল সরকার আন্দোলন দমনে পুলিশের পাশাপাশি লেলিয়ে দেয় দলীয় ও ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীদের। দলের সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় রাষ্ট্রের অস্ত্র।

 

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর ফুঁসে ওঠে গোটা ক্যাম্পাস। ১৬ জুলাই সকাল থেকে ছাত্রীরাসহ সব বাসিক হলের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন। তাদের দমনে পুলিশসহ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অবস্থান নেয় টিএসসি এলাকায়। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের গণজোয়ারের মুখে দুপুরের পর ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে যায় ছাত্রলীগ ও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা। ক্যাম্পাসজুড়ে দিনভর বিক্ষোভের পর বিকাল থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী জড়ো হতে থাকেন শহীদ মিনারে। সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসজুড়ে র‌্যালি করার পর তারা শেষ করেন ওইদিনের কর্মসূচি।

রামপুরা ব্রিজ থেকে নতুনবাজার ছাড়িয়ে বিশ্বরোড পর্যন্ত ১৬ জুলাই দিনভার বিক্ষোভ মিছিল করেন ওই এলাকায় অবস্থিত ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ, সাউথ ইস্ট, ইউনাইটেড, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটিসহ আরো বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এছাড়া ঢাকার সায়েন্সল্যাব এলাকা, মহাখালীতে তিতুমীর, বিএফ শাহীন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার ও রাজাকারের নাতিপুতি ইস্যুতে বিক্ষোভ, রাস্তা অবরোধ করেন।

১৬ জুলাই চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, ময়মনসিংহ, খুলনা, সিলেট, কুমিল্লা, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিক্ষোভ ও রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন করতে থাকেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা গুলি চালায়। এতে ওইদিন অনেকে নিহত হন। নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ছয়জনের পরিচয় পরে শনাক্ত করা গেছে।

রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। এ সময় ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলির সামনে দুই হাত দুদিকে প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কিন্তু শেখ হাসিনার খুনি পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র একজন শিক্ষার্থীর ওপর খুব কাছ থেকে একের পর এক গুলি চালাতে থাকে। শরীরে গুলি লাগার পরও আবু সাঈদ দৌড়ে পালাননি; বরং তিনি বারবার একই ভঙ্গিতে দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের দিকে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার সতীর্থরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় পরে তিনি শাহাদতবরণ করেন ।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশে হাসিনা পতন আন্দোলনের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। ১৬ জুলাইকে ‘জুলাই শহীদ দিবস’র মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। হাসিনা পতন আন্দোলনে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং তাদের অধিকাংশ নিহত হয়েছেন ১৯ জুলাই। ১৮ জুলাইও অনেক মানুষ শহীদ হয়েছেন। কিন্তু ১৯ জুলাইয়ের পরিবর্তে ১৬ জুলাই শহীদ দিবস ঘোষণা করা হয়েছে আবু সাঈদের শাহাদতের স্মরণে। কারণ এই শাহাদতের মাধ্যমেই লেখা হয়েছিল হাসিনার পতন।

১৬ জুলাই চট্টগ্রামের ষোলশহর, মুরাদপুর ও ২ নম্বর গেট এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে শহীদ হন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম। একই ঘটনায় ওইদিন মুরাদপুরে শহীদ হন ওমরগণি এমইএস কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ শান্ত। এদিন বহদ্দারহাট-ষোলশহর, চট্টগ্রাম আসবাবপত্রের দোকানের ফারুক নামের এক কর্মচারী গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদতবরণ করেন।

ঢাকার সায়েন্সল্যাব-সিটি কলেজ এলাকায় গুরুতর আহত হয়ে শাহাদতবরণ করেন শাহজাহান নামের একজন হকার। ঢাকা কলেজ এলাকায় সংঘর্ষে মৃত্যুবরণ করেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী সবুজ আলী।

১৬ ‍জুলাই দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনে ভীত হয়ে সরকার ওইদিন রাতেই সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। সমস্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের। ৫ আগস্ট পতনের আগ পর্যন্ত সরকার দফায় দফায় ইন্টারনেট বন্ধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ এবং কারফিউ জারি করে। আন্দোলন দমনে গণহত্যা ও গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন, তীব্র ভয়ভীতি ছড়িয়ে দেওয়াসহ যাবতীয় দমনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু জালিম শাসকের বিরুদ্ধে গণমানুষের যখন মৃত্যুভয় দূর হয়ে যায়, তখন আর কোনো কিছুতেই তাদের দমন করা যায় না।

লুটেরা, খুনি, মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনারও শেষ রক্ষা হয়নি। তীব্র গণরোষের মুখে শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট তিনি তার প্রভুদেশ ভারতে পালিয়ে যান। দেশবাসী তখন বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো রাস্তায় নেমে আসেন স্লোগান দিতে দিতে—‘এই মাত্র খবর এলো, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেল।’ শেখ হাসিনার মতো জালিম শাসক আর ভারতের সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে আবু সাঈদসহ যারা জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, অবর্ণনীয় নির্যাতন ও ত্যাগ স্বীকার করেছন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন করেছেন, তাদের ঋণ কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।

 

লেখক :

মেহেদী হাসান

সহকারী সম্পাদক, আমার দেশ