চারদিকে শুধু পানি। কোথাও গলাসমান, কোথাও কোমরসমান। টানা বর্ষণ আর বন্যায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের বহু জনপদ। রাস্তাঘাট ডুবে গেছে, বন্ধ হয়ে গেছে যান চলাচল। এমন দুর্যোগের মধ্যেও থেমে থাকেনি নতুন জীবনের আগমন। এ যেন বিপদের ঘনঘটার মাঝেও প্রাণের সঞ্চার। অন্যদিকে, এমন ঘোর দুর্দিনে প্রতিটি নবজাতকের জন্ম যেন হয়ে উঠেছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের একেকটি লড়াইয়ের গল্প।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্য বলছে, গত চার থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১০ দিনে জেলার ১৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৬৫টি নবজাতকের জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫৪টি স্বাভাবিক প্রসব এবং ১১টি সিজারিয়ান। সংখ্যার এই হিসাবের আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য সংগ্রাম, ভয় আর শেষ পর্যন্ত বিজয়ের গল্প। গলাসমান পানি পেরিয়ে কাঙ্ক্ষিত সন্তানের পৃথিবীর আলো দেখার গল্প।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ জুলাই লোহাগাড়া উপজেলার পশ্চিম আমিরাবাদ ইউনিয়নের খৈয়ারকুল গ্রামের মিজবাহুল জান্নাতের প্রসববেদনা ওঠে। কিন্তু বাড়ি থেকে হাসপাতালের চার কিলোমিটার সড়ক তখন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ছুটে যান। গলাসমান পানির মধ্যে প্রায় ৬০০ মিটার স্ট্রেচারে বহন করে তাকে নিরাপদ স্থানে এনে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনি একটি সুস্থ পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। দুর্যোগের সেই দিনে শিশুটির কান্না যেন বেঁচে থাকারই ঘোষণা হয়ে ওঠে।
একদিন পর, ১০ জুলাই, বাঁশখালীর গুনাগরী ইউনিয়নের দত্তপাড়ায় কোমরসমান পানির মধ্যে প্রসববেদনা শুরু হয় রিমা মল্লিকের। চারদিকে পানি, যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগও ছিল না। পরিবারের সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে দেন। সেখানে তিনি একটি সুস্থ কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। বর্তমানে মা ও নবজাতক দুজনই সুস্থ আছেন। বন্যার সেই বিভীষিকার মধ্যে তাদের বেঁচে ফেরার গল্প স্থানীয়দের চোখে এক অলৌকিক ঘটনা।
বাঁশখালীর বৈলছড়ি ইউনিয়নের চেচুরিয়া এলাকায় আরেকটি দৃশ্য নাড়িয়ে দেয় পুরো দেশকে। বন্যার পানিতে আটকা পড়ে একটি পরিবার। তাদের সঙ্গে ছিল আট মাস বয়সি একটি শিশু। শিশুটিকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা বড় একটি রান্নার পাতিলকে ভেলা বানান। সেই পাতিলে শিশুটিকে ভাসিয়ে গলাসমান পানি পাড়ি দিয়ে উদ্ধার করা হয়। মানবিক এই অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রশংসা কুড়ায় দেশজুড়ে।
এসব ঘটনার মধ্যেই চট্টগ্রামের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে অব্যাহত ছিল সন্তানের আগমনে প্রয়োজনীয় প্রসূতি সেবা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বন্যাকবলিত সময়ে চট্টগ্রামের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮৩টি নবজাতকের জন্ম হয়েছে ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এর মধ্যে ৮২টি স্বাভাবিক প্রসব এবং একটি সিজারিয়ান। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৯টি নবজাতকের জন্ম হয়েছে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
এছাড়া রাউজানে ৩৭টি (৩৪টি স্বাভাবিক ও তিনটি সিজারিয়ান), আনোয়ারায় ৩১টি (৩০টি স্বাভাবিক ও একটি সিজারিয়ান), হাটহাজারীতে ২৮টি, বোয়ালখালীতে ২৩টি, সীতাকুণ্ডে ১৮টি, সাতকানিয়ায় ১৬টি, চন্দনাইশে ১৫টি, রাঙ্গুনিয়ায় ১৫টি (১৪টি স্বাভাবিক ও একটি সিজারিয়ান), পটিয়ায় ১৪টি (১০টি স্বাভাবিক ও চারটি সিজারিয়ান), মিরসরাইয়ে ১৪টি (১৩টি স্বাভাবিক ও একটি সিজারিয়ান), সন্দ্বীপে ১২টি এবং লোহাগাড়ায় ১০টি (৯টি স্বাভাবিক ও একটি সিজারিয়ান) নবজাতকের জন্ম হয়েছে।
দুর্যোগের মধ্যে গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে পৌঁছানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা ও সড়ক ডুবে যাওয়ায় স্বজনদের সহায়তায় নৌকা, অ্যাম্বুলেন্স কিংবা বিকল্প যানবাহনে করে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। তারপরও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরবচ্ছিন্ন সেবায় নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বন্যা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় চট্টগ্রামের দুর্গত এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্য বিভাগ ২৮৫টি মেডিকেল টিম গঠন করেছে। পাশাপাশি সার্বক্ষণিক মোবাইল মেডিকেল টিম ও কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, অতিবৃষ্টি ও বন্যার মতো দুর্যোগে গর্ভবতী মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। এ কারণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ২৪ ঘণ্টা জরুরি প্রসূতি ও নবজাতক সেবা সচল রাখা হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দায়িত্ব পালন করেছেন, যাতে কোনো প্রসূতি জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন।
ডা. জাহাঙ্গীর আলম আরো বলেন, দুর্যোগের মধ্যেও নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা স্বাস্থ্য বিভাগের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল। চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যার মধ্যেও শত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ৩৬৫ নবজাতকের জন্ম নতুন আশার বার্তা হয়ে এসেছে। জন্মের পর নবজাতকদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ, টিকাদান ও প্রসূতি মায়েদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী ও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।