ঘন ঘন লোডশেডিং, সরবরাহ লাইনে ত্রুটিসহ সেবা প্রদানে নানা অনিয়মের কারণে সারাদেশের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ভোগান্তি-অসন্তোষ এমনিতেই চরম আকার ধারণ করেছে। তারমধ্যে জুন মাসে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর দুই গুণ-তিন গুণ বাড়তি বিল চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, একই সময়ে লাইন মেরামতের নামে দীর্ঘ সময় ধরে দফায় দফায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। বাড়তি দুই গুণ-তিন গুণ বিল এবং লাইন মেরামতের নামে দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা- উভয়টিই করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে। এবং এতে সরাসরি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিমের নির্দেশ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এসবের উদ্দেশ্য হলো, নিজেদের দুর্নীতি-অনিয়ম চাপা দেওয়া, সিস্টেম লস কম দেখানো। একেতো সিস্টেম লস হলো বিদ্যুৎ চুরি। সেই চুরি ঢাকতে গিয়ে এখন আরেক রকমের চুরির আশ্রয় নিয়েছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড। অর্থ বছরের শুরুতে বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পুরো বছরের কাজের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে একটি চুক্তি করেন। যার একটি প্যারামিটার হচ্ছে সিস্টেম লস বিগত বছরের তুলনায় কমানো। এটা মূলতঃ বিদ্যমান বিতরণ সিস্টেমের উন্নয়নের মাধ্যমে কমানোর কথা থাকলেও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ সিস্টেমের উন্নয়ন না করে বিকল্প পথে অর্জনের চেষ্টা করে থাকে। যার প্রমাণ রয়েছে জুন মাসে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর বিদ্যুৎ বিলে। এই চুরি তারা করে সরকার তথা বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি ঠিক রাখার জন্য। অথচ তাদের এই ভাবমূর্তি বজায় রাখতে গিয়ে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোটি কোটি মানুষের যে নাভিশ্বাস অবস্থা, এ বিষয়ে তাদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের এই অন্যায় আচরণের বিপরীতে সারাদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক সময়ে। দেশের বিভিন্ন স্থানে পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা বিক্ষোভ মিছিল এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অফিস ঘেরাও করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হয়েছে। বিদ্যুৎ গ্রাহকদের অভিযোগগুলো আমলে নেওয়ার বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয় সরকারের তরফ থেকে।
এ ব্যাপারে হটলাইনও খোলা হয়। সরকারের এসব তড়িৎ পদক্ষেপের কারণে পরিস্থিতি এ মুহূর্তে আপাততঃ শান্ত হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের বর্ধিত বিলের অভিযোগের সুরাহা করা গেলেও সেবা সংক্রান্ত নাজুক পরিস্থিতির কোনোই উন্নতি ঘটানো যাবে না, যতক্ষণ না পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটানো যাবে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড পরিদর্শন করে এ বছর পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সিস্টেম লস ২% কমানোর নির্দেশনা দিয়েছেন। পরবর্তীতে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের এক সভায় মন্ত্রীর এ নির্দেশনাটির কথা উল্লেখ করে বোর্ডের সিস্টেম অপারেশন দপ্তরের পরিচালক পরিতোষ সূত্রধর বলেছেন, মন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক যেকোন মূল্যে এ বছর সিস্টেম লস ২% কমাতে হবে। পরিচালক পরিতোষ সূত্রধর বোর্ডসভায় কথাটি উল্লেখ করেছেন চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিমের পক্ষ থেকেই। এরপরেই ‘যে কোনো মূল্যে’ ২% সিস্টেম লস কমানোর জন্য মাঠ পর্যায়ে সরাসরি নির্দেশ আসে। এরজন্য যা যা করার দরকার সবই করতে বলা হয়।
যদিও মন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন মূলতঃ সরবরাহ সিস্টেমের উন্নয়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চুরি কমিয়ে এনে সিস্টেম লস কমানোর জন্য। কিন্তু পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ সেদিকে না গিয়ে কারসাজির মাধ্যমে সিস্টেম লস কমিয়ে দেখানোর পথে হেঁটেছেন। এতে বস্তুতঃ সিস্টেম লস তো কমছেই না, গ্রাহকের ভোগান্তি বেড়েছে। গ্রাহক আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
একেতো বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এই সময়ে বর্ধিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে গ্রাহকদের, তারমধ্যেই ঘটেছে এমন অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো। এটিকে সারাদেশের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ক্ষেপিয়ে তোলার ষড়যন্ত্র বলেও আখ্যায়িত করছেন কেউ কেউ। পল্লী বিদ্যুতের মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীরা যখন এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে, বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতেই রাজি হননি। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যাপারে ফোন আসলে চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিম তা রিসিভ করেননি। অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও চরমভাবে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন এই সময়ে।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দুঃশাসনে সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডও অনিয়ম-দুর্নীতি আর লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সেই ধারা এখনো অব্যাহত আছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের যাবতীয় মালামাল কেনা হয় কেন্দ্রীয়ভাবে। তা ব্যবহারের জন্য পাঠানো হয় সমিতিগুলোতে। তাতে দেখা যায় যে, প্রত্যেকটি মালামালই অত্যন্ত নিম্নমানের। ভয়াবহ অনিয়মের মধ্য দিয়ে নিম্নমানের মালামাল অতি উচ্চ মূল্যে কেনা হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সমিতিগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী মালামাল পাওয়া যায় না। আবার অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় মালামাল দফায় দফায় কিনে তা সমিতিগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। স্টোরে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে তা নষ্টও হয়ে যাচ্ছে। এসবের পুরো দায় পড়ছে গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর।
লুটেরা-ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর ২২ আগস্ট, ২০২৪ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিমকে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে প্রেষণে পদায়ন করা হয়। ক্রমান্বয়ে রসাতলের দিকে যাওয়া এ প্রতিষ্ঠানটি টেনে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। কিন্তু দেখা গেলো, চেয়ারম্যান জিয়া-উল-আজিম পূর্বসূরিদের পথেই হেঁটেছেন। চেয়ারম্যান পদে তাঁর প্রায় দু’বছর হতে চললো। এই সময়ে তিনি অতীতের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ন্যূনতম নজিরও স্থাপন করতে পারেননি বা করেননি। বরং ফ্যাসিস্ট সরকারের সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়ে দুর্নীতির ধারা বজায় রেখেছেন তিনি, এমন গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়ানোর পরিবর্তে নতুন সংকটে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক নিয়ম-শৃঙ্খলা ও সেবাদানের মানের অবনতি ঘটেছে। বরং তার সময়ে প্রতিষ্ঠানটিতে কেন্দ্র এবং সমিতিগুলোর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বেশি। অতীতের অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এ মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানটি নাজুক অবস্থায় পড়েছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যেও ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে। এরজন্য চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল জিয়া-উল-আজিমের স্বেচ্ছাচারিতা, দায়িত্বে অবহেলা ও দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডকে দায়ী করছেন বোর্ড সংশ্লিষ্টরা। এমন অবস্থা চলতে থাকলে প্রতিষ্ঠানটির আরও দ্রুত অবনতি ঘটবে এবং এক পর্যায়ে পুরো সিস্টেমই ভেঙে পড়বে। তাই সরকারকে এ ব্যাপারে অতিদ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে অভিজ্ঞমহল থেকে।
শীর্ষনিউজ