Image description

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের মৃত্যুর দুই বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু এগোয়নি তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে ঘোষিত প্রকল্প। মা-বাবা যেমন হত্যার বিচারের অপেক্ষায়, তেমনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করছেন তোরণ, জাদুঘর ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণকাজ শুরুর।

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার জাফরপাড়া বাবনপুর গ্রামে আবু সাঈদের বাড়িতে গেলে এখনো শোকের ভার অনুভব করা যায়। ঘরের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে ছেলের ব্যবহৃত জামা-কাপড়, বই আর স্মৃতিচিহ্ন আগলে রাখা এক পরিবার। মা মনোয়ারা বেগম মাঝেমধ্যে ছেলের কাপড় বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বাবা মকবুল হোসেন দিনের বড় একটি সময় কাটান ছেলের কবরের পাশে।

কবরের পাশে বসে মকবুল হোসেন বলেন, ‘এই জায়গায় আমার কবর হওয়ার কথা ছিল। সেখানে আমার ছেলেকে কবর দিতে হয়েছে। সারা দিন ছেলের কবরের পাশে বসে থাকি। ছেলে নেই ভাবতেই বুক ফেটে যায়।’

অভাবের সংসার থেকে উঠে এসে আবু সাঈদ ভর্তি হয়েছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছরের ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেট এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। তাঁর মৃত্যু আন্দোলনকে নতুন মোড় দেয় এবং পরবর্তী গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হয়ে ওঠে।

মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘ছেলের কথা মনে পড়লে ওর কাপড়গুলো বুকে জড়িয়ে ধরি। আমার আগে ছেলে চলে গেছে, এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে।’

শহীদ আবু সাঈদের ছোট বোন সুমি খাতুন বলেন, ‘সাঈদ ভাই আমাদের পরিবারের একমাত্র ব্যক্তি যে নিজের ইচ্ছায় নিজের চেষ্টায় এতদূর পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। আমরা যখন একখানে হইতাম, তখন লেখাপড়া নিয়েই কথা হতো।’

সেদিনের স্মৃতি মনে করে মকবুল হোসেন জানান, পরিবার জানতই না ছেলে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ১৬ জুলাই দুপুরে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পান। পরে স্বজনেরা রাতভর খোঁজাখুঁজির পর তাঁর মরদেহের সন্ধান পান।

মকবুল হোসেন বলেন, ‘ঢাকায় লেখাপড়া করা প্রতিবেশী ভাতিজা খবর দেয়, আবু সাঈদ মারা গেছে । ছাত্ররা লাশ নিয়া আসির ধরছে, পুলিশ রাস্তা থাকি লাশ কাড়ি নিছে। কাড়ি নিয়া যাওয়ার থাকি নিখোঁজ। রাত ২টার দিকে সন্ধান পাই লাশ মর্গে। সেই লাশ আনির চাইছে, দেয় না। লাশ রাস্তাত ঠেক দিছে। পুলিশ প্রশাসন ভাঙি আসি রাতে মাটি দিতে বলছে। ভেকু দিয়া খুঁড়ি পুঁতি থুইবে। এ রকম বহু জুলুম-অত্যাচার করেছে ।’

তিনি জানান, এখন একটাই চাওয়া, তিনি যেন জীবিত থাকতে ছেলের হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেন।

প্রতিবেশী জাবেদ ইসলাম বলেন, আবু সাঈদ জীবিত থাকাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের নিয়ে শীতবস্ত্র ও ত্রাণ বিতরণ করতেন। মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর স্বভাব।

শহীদ আবু সাঈদের সহযোদ্ধা সাবেক সমন্বয়ক শামসুর রহমান সুমন বলেন, শহীদ আবু সাঈদ এই গণঅভ্যুত্থানের একটি আইকনিক চরিত্র। ১৬ জুলাই যে তাঁর বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া, এটি আসলে আমি একদিনের ঘটনা প্রবাহ বলব না। ছাত্রলীগ ১১ জুলাই তাঁকে চড়থাপ্পড় দেয়, গলা চেপে ধরে। ১৬ তারিখ তাঁকে টার্গেট করে হত্যা করা হয়।

গতি নেই আবু সাঈদের স্মৃতি সংরক্ষণে

পরিবারের এই অপেক্ষার পাশাপাশি থমকে আছে আবু সাঈদের স্মৃতি সংরক্ষণের ঘোষিত উদ্যোগও। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে তোরণ, জাদুঘর, স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও এক বছর পেরিয়ে গেছে, দৃশ্যমান কোনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।

২০২৫ সালের ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটে এসব প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। সে সময় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কর্মকর্তাসহ আবু সাঈদের বাবা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু এখনো প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটের পাশে স্থাপিত ভিত্তিপ্রস্তরের ফলকটি অযত্নে পড়ে আছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা সেখানে এলেও স্থায়ী কোনো স্মারক দেখতে পান না।

আবু সাঈদের সহযোদ্ধা ও বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শামসুর রহমান সুমন বলেন, দুই বছরেও যদি প্রথম শহীদের তোরণ ও জাদুঘর নির্মাণ না হয়, তাহলে তা ইতিহাসের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। হত্যার রায় হলেও তা কার্যকর করার অগ্রগতিও দেখা যাচ্ছে না।

শহীদ আবু সাঈদের আরেক সহযোদ্ধা জাহিদ হাসান জয় বলেন, ‘সিনিয়র হিসেবে আমরা প্রথমে আবু সাঈদ ভাইকে পেয়েছিলাম। ১৬ জুলাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় তিনি আসলে টার্গেটেড কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘আবু সাঈদ শুরু থেকেই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। রংপুরের আন্দোলন যারা সংগঠিত করেছে, তাদের একজন সাঈদ। বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে স্মরণে তাঁর নামে একটি গেট করার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এখনও কাজ শুরু হয়নি। তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলাধুলা হয়, একটা হল করার ঘোষণা হয়েছে।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলী বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের ডিপিপি ইতিমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। ইউজিসির অনুমোদনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একনেকে উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন মিললেই মূল নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।

১৬ জুলাই বেরোবির কর্মসূচি

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে আবু সাঈদের সমাধি পীরগঞ্জ উপজেলার জাফরপাড়া বাবনপুর গ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রার মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়ে। সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করা হয়। এরপর সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে প্রশাসনিক ভবনের দক্ষিণ গেটে লাল ব্যাজ ধারণ ও শোক র‍্যালি অনুষ্ঠিত হবে।

সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে স্বাধীনতা স্মারক মাঠে শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিচারণ ও পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে ‘জুলাই শহীদ স্মরণে’ বিশেষ স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া বিকেল ৫টায় কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ আসর দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।