সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী ও প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল ৯ম গ্রেডে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই যুগান্তকারী ঘোষণায় আনন্দের জোয়ার বইছে দেশের প্রায় চার লাখ প্রাথমিক শিক্ষকের মধ্যে। এই উদ্যোগকে ‘মর্যাদা ও অধিকার’-এর ঐতিহাসিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন তারা।
ঘোষণাটি আসার পর থেকেই সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক স্কুলেই শিক্ষকরা একে অপরকে মিষ্টি খাইয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। তাদের পরিবারেও বইছে আনন্দের জোয়ার।
সরকারের শিক্ষকবান্ধব এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি আমার দেশকে বলেন, দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান হতে চলেছে প্রাথমিক শিক্ষকদের। প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণায় শিক্ষকরা খুবই উচ্ছ্বসিত।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১০ম গ্রেডের জন্য আন্দোলন করেছিলাম। তখন দাবি পূরণের পরিবর্তে আমাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। এখন সরকার নবম গ্রেডে উন্নীত করায় আমরা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি পাচ্ছি। এর ফলে প্রাথমিক শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষারও গুণগত উন্নয়ন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শহীদুল ইসলাম নামে এক সহকারী শিক্ষক বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার ছিলাম। একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অন্য পেশায় যেখানে ৯ম গ্রেড দেওয়া হচ্ছিল, সেখানে আমরা পিছিয়ে ছিলাম। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশা দূর হবে। এখন শিক্ষকরা আরো দ্বিগুণ উৎসাহে ক্লাসরুমে যাবে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের এই উদ্যোগ খুবই ইতিবাচক। শিক্ষা অধিকার সংসদের সদস্যসচিব মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন আমার দেশকে বলেন, প্রাথমিক শিক্ষাকে উন্নত করার প্রথম শর্তই হলো শিক্ষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেড এবং প্রধান শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড থেকে সরাসরি ৯ম গ্রেডে (প্রথম শ্রেণি) উন্নীত করার মাধ্যমে মেধাবী তরুণরা এখন প্রাথমিকে শিক্ষকতায় আসতে আরো বেশি আগ্রহী হবে। এতে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন হবে।
এই আপগ্রেডেশনের ফলে শিক্ষকদের মূল বেতন ও অন্যান্য ভাতাদি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে, যা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে বড় ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে জাতীয় বেতন স্কেলে নবম গ্রেডে শুরুর মূল বেতন ২২ হাজার, দশম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা, ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ টাকা এবং ১৩তম গ্রেডে ১১ হাজার টাকা। মূল বেতনের সঙ্গে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা যুক্ত হয়ে মোট বেতন নির্ধারিত হয়।
এদিকে প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতনের (বেসিক) ওপর গড়ে ৪০-১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের (১০ম থেকে ২০তম গ্রেড) বেতন বেশি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
পাঠদানে গতি ফেরার আশা
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের অবসান ঘটবে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সরাসরি শ্রেণিকক্ষের পাঠদানে। শিক্ষকরা এখন কোনো আর্থিক বা সামাজিক হীনম্মন্যতা ছাড়াই মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারবেন।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় নেতারা যৌথ বিবৃতিতে বলেন, এই আনন্দ শুধু বেতন বাড়ার নয়, এটি মূলত রাষ্ট্রের প্রাথমিক শিক্ষকদের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি দেওয়ার আনন্দ। আগামী দিনগুলোতে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত আরো মজবুত করতে শিক্ষকরা তাদের সর্বোচ্চ উজাড় করে দেবেন বলে তারা অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
গত মঙ্গলবার প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সিদ্দিকুর রহমান স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক শিক্ষকদের ৯ম গ্রেড প্রদানে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করায় শিক্ষক সমাজের মধ্যে নতুন স্বপ্ন উজ্জীবিত হতে দেখা দিয়েছে। এজন্য প্রতিমন্ত্রীকে প্রাথমিক শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন।
এর আগে গত রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ও পদমর্যাদা উন্নীত করে ৯ম গ্রেডে নিয়ে আসার বিষয়ে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেছে। শিক্ষকদের ৯ম গ্রেডে উন্নীত করা হলে অতিরিক্ত দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে, যার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ বাজেটে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে সারা দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী এক কোটির বেশি। শিক্ষক রয়েছেন পৌনে চার লাখের বেশি। সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ তিন লাখ ৬৯ হাজার ২১৬টি, বর্তমানে কর্মরত তিন লাখ ৫২ হাজার ২০৮ জন।