Image description

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে আজকের এই দিনে প্রথম শহীদ হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তার আত্মত্যাগে দেশ ধাবিত হয় গণঅভ্যুত্থানের দিকে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দিয়ে পুলিশের অব্যাহত গুলির সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দিয়েছিলেন আবু সাঈদ। তখন তাকে লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে পুলিশ। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ছাত্র-জনতার আন্দোলন এক দফায় রূপ নেয়, যার জেরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। আবু সাঈদকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এই দিনটিকে বর্তমান সরকার ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

 

যেভাবে আবু সাঈদ শহীদ হন

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সেই জুলাই মাসের শুরু থেকে রংপুরে গণআন্দোলনে পরিণত হয়। এই আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। আর এর নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ।

 

আন্দোলনের বিক্ষোভ মিছিলে উত্তাল ছিল রংপুর নগরীর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রথম দিকে মিছিলে ১০-১৫ জনের মতো উপস্থিতি দেখা গেলেও দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা হাজার ছাড়িয়ে যায়। প্রতিদিন রংপুর নগরী থেকে মিছিল আসত বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। সেই মিছিলে আস্তে আস্তে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী যোগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা এই আন্দোলনকে দমন করতে সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে অস্ত্রশস্ত্রসহ ঝাঁপিয়ে পড়েন। দফায় দফায় হামলা চালান নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর। পুলিশ তাদের পক্ষ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর মুহুর্মুহু রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি বর্ষণ করে।

 

১৬ জুলাই সকালে রংপুর জিলা স্কুল থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। সেখানে বিভিন্ন কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এরপর আড়াই কিলোমিটার দূরে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যখন মিছিলটি যাত্রা করে, প্রেসক্লাব অতিক্রম করার আগেই তাতে যোগ দেয় সাধারণ শিক্ষার্থী ছাড়াও সব স্তরের জনতা।

 

 

আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন। ছবি: এশিয়া পোস্ট
আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

 

 

মিছিলটি রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে পৌঁছালে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাতে থাকেন। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও জনতা প্রতিরোধ গড়ে তুললে পুলিশও হামলাকারীদের পক্ষ নিয়ে গুলি, রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে শতাধিক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন।

 

এ সময় আবু সাঈদ একাই পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে বলতে থাকেন, ‘গুলি করলে কর, আমি বুক পেতে দিয়েছি’। এ সময় পুলিশের টার্গেট করা গুলিতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা আবু সাঈদকে মৃত ঘোষণা করেন। আবু সাঈদের মুখ দিয়ে তখন রক্ত বের হচ্ছিল, সারা শরীরে ছিল গুলি আর রাবার বুলেটের ক্ষত। এই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় এবং আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ।

 

প্রত্যক্ষদর্শী ও সহযোদ্ধাদের বক্তব্য

জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই শহীদ আবু সাঈদের সঙ্গে নেতৃত্ব দেন বেরোবির তৎকালীন সমন্বয়ক শাহরিয়ার সোহাগ। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। যেদিন আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হন, সে সময় তিনিও গুলিবিদ্ধ হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

 

শাহরিয়ার সোহাগ বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শুরুতে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাতেগোনা ৮ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী ছিলাম। ছোট ছোট মিছিল করতাম। বেরোবি ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া, সাধারণ সম্পাদক শামীম ও তাদের ক্যাডাররা আমাদের নানা হুমকি-ধমকি দিতেন। পোমেল বড়ুয়া আবু সাঈদকে ডেকে লাথি-ঘুষি মেরে শাসিয়েছিলেন। কিন্তু আবু সাঈদসহ আমরা দমে যাইনি। আন্দোলন বেগবান হতে শুরু করল আস্তে আস্তে। মিছিল দীর্ঘ হতে লাগল। জুলাইয়ের ৫ তারিখের পর হাজার হাজার শিক্ষার্থী নগরী থেকে মিছিল নিয়ে বেরোবির সামনে আসত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সব হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে যোগ দিতে শুরু করলেন। নারী শিক্ষার্থীরাও দলে দলে যোগ দিয়েছিলেন।

বেরোবি শিক্ষার্থী আয়ান বলেন, আমি আবু সাঈদের সঙ্গেই ছিলাম। তার অসীম সাহস আমাকে আন্দোলনে নামতে সাহস জুগিয়েছে। আবু সাঈদের ওপর পুলিশ গুলি করার সময় আমি কয়েক গজ দূরে ছিলাম। আবু সাঈদ বারবার পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত প্রসারিত করে বলছিলেন, ‘বুক পেতে দিয়েছি, কর গুলি’। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার যে দুঃসাহস আবু সাঈদ দেখিয়েছেন, তা ইতিহাসে বিরল। তার মৃত্যুশোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে মানুষ স্বৈরাচারী সরকারকে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য করেছে। তাই আবু সাঈদের আত্মত্যাগই ছিল আন্দোলনের প্রধান টার্নিং পয়েন্ট।

 

মৃত্যুর আগে ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে চান বাবা

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে শহীদ আবু সাঈদের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার বাবা মকবুল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, সরকার যে আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় প্রকাশ করেছে, এই রায়ে আমরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। তবুও যে বিচার বা রায় এসেছে, সেটা অতি দ্রুত কার্যকর করা হোক—সরকারের কাছে এই দাবি জানাই। আমি বৃদ্ধ মানুষ, আমি যেন নিজের চোখে ছেলের হত্যার বিচার দেখে মরতে পারি, এটাই আমার একমাত্র কামনা।

 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে শহীদ পরিবারের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে যোগাযোগ করা হয়নি। তা ছাড়া যে জন্য আমার ছেলে জীবন দিয়েছে, সেই বৈষম্য যেন সরকার পুরোপুরি দূর করে। পাশাপাশি দেশের সব মানুষ যেন শান্তিতে বসবাস করতে পারে, এটাই আমার চাওয়া।

 

হত্যাকারীদের বিচারের জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি আস্থা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আস্থা অবশ্যই আছে। রায় যখন দিয়েছে, তখন বিচারও করবে। তবে প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুত হওয়া দরকার। অতি তাড়াতাড়ি বিচার সম্পন্ন করা ও রাষ্ট্র সংস্কার করা প্রয়োজন।

 

জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল কি না জানতে চাইলে মকবুল হোসেন বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রামে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি যেতে পারেননি, তবে তার অন্য ছেলে সেখানে গেছেন।

 

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফিরে আসার বিষয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজবের জবাবে তিনি বলেন, ‘তার তো ফাঁসির হুকুম হওয়া উচিত। তার দেশে আসার বিষয়টি তো ভুয়া কথা। আইন অনুযায়ী যেটা রায় হবে, সে অনুযায়ী যেন দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা হয়, তাতেই আমি সন্তুষ্ট।’

 

নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ আবু সাঈদ

কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের নিজ ক্যাম্পাস বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তার স্মৃতি সংরক্ষণ, তার আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার অবদান তুলে ধরার লক্ষ্যে ‘শহীদ আবু সাঈদ তোরণ’, ‘শহীদ আবু সাঈদ স্মৃতি জাদুঘর’ ও ‘শহীদ আবু সাঈদ স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দীর্ঘ সময় পরও মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। এ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে হতাশা রয়েছে।

 

এসব বিষয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, শহীদ আবু সাঈদকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য আমরা নানা পদক্ষেপ নিয়েছি। আবু সাঈদের স্মৃতিকে অম্লান রাখার জন্য আমরা যে সমস্ত কর্মসূচি গ্রহণ করেছি, তা বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানিয়ে দেবে তিনি কী অবদান রেখে গেছেন। শহীদ আবু সাঈদ গেট ও জাদুঘর তার অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। এ ছাড়া শহীদ আবু সাঈদ ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু করা হয়েছে, শহীদ আবু সাঈদ কর্নার করা হয়েছে এবং স্মৃতিস্তম্ভ করা হচ্ছে। এগুলো সম্পন্ন হতে একটু সময়ের প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এসব বিষয়ে সব সময় আন্তরিক। আবু সাঈদকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য এই দিনটিকে বর্তমান সরকার ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, এজন্য আমি সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।

 

এদিকে জুলাই শহীদ দিবস ও আবু সাঈদের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কবর জিয়ারত, র‍্যালি ও আলোচনা সভা। রংপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও দিনব্যাপী নানা আয়োজনে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।