রাজপথের উত্তাল রক্তঝরা দিনগুলোতে কোনো কিছুই দমাতে পারেনি প্রাণ বাজি রাখা ‘জুলাই যোদ্ধা’দের। বুলেটের ভয়কে জয় করেই জুলাই যোদ্ধারা দেশকে উপহার দিয়েছিলেন মুক্তির সকাল।
কিন্তু ওই সময় রাজপথে গুলিবিদ্ধ হয়ে যেসব জুলাই যোদ্ধা হাত-পা, চোখ কিংবা স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছিলেন। তাঁদের কারো দিন কাটছে হাসপাতালের ফলোআপ চিকিৎসায়, কেউ বা নিচ্ছেন নিয়মিত ফিজিওথেরাপি। আবার কেউ কৃত্রিম অঙ্গ নিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, দৃষ্টিশক্তি হারানো যোদ্ধারা বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নতুন জীবনের সন্ধান করছেন।
বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় চার হাজার আহত জুলাই যোদ্ধা নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে অন্তত আড়াই হাজার আহত জুলাই যোদ্ধাকে চিকিৎসার জন্য নিয়মিত রাজধানীতে আসতে হচ্ছে। এঁদের মধ্যে দুই হাজার জন স্থায়ীভাবে শরীরের কোনো না কোনো অঙ্গ হারিয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।
থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অন্তত ১০ জন এখনো শয্যাশায়ী। এঁদের মধ্যে মিলন ও মুরাদের শারীরিক অবস্থা সন্তোষজনক নয়।
অন্যদিকে জুলাই আন্দোলন চলাকালে চট্টগ্রাম শহরে মুরাদের গলার নিচের অংশে গুলি ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে মুরাদ অন্যের সাহায্য ছাড়া চলতে পারেন না। গুলি লাগার পর থেকে কথা বলাও বন্ধ হয়ে যায়।
এই দুজনের চেয়ে কিছুটা ভালো আছেন গার্মেন্ট শ্রমিক বুলবুল আহমেদ আকাশ। জুলাই আন্দোলন চলার সময় সাভারে বাইপাইল সড়কে বুকের বাঁ পাশে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। সেই থেকে আকাশের শরীরের বাঁ পাশ পুরোপুরি অবশ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিভিন্নভাবে আহত জুলাই যোদ্ধাদের দেশে-বিদেশে চিকিৎসা, ভাতা, এককালীন অনুদানসহ বিভিন্ন খাতে সরকার প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে বলে জানা গেছে। তবে আহতদের অনেকে বলছেন, সরকারের এই ব্যয়ের মধ্যে ভাতার চেয়ে চিকিৎসা ব্যয় বেশি। জুলাই যোদ্ধাদের প্রত্যাশিত পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের অভাবে বর্তমানে অনেক পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে।
চিকিৎসার চেয়ে বড় সংকট পুনর্বাসন : জুলাই আন্দোলনের সময় তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী তামিম ইকবালের কোমরের দুটি ডিস্ক ভেঙে যায়। এরপর দুই বছর পার হয়েছে। কিন্তু তাঁকে নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিতে হচ্ছে। তামিম বলেন, ‘চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন জরুরি। অনেক আহত এখনো চিকিৎসাবঞ্চিত। যাচাই-বাছাইয়ের সময় প্রকৃত আহত কেউ যেন বাদ না পড়েন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ আন্দোলনের সময় নিরাপত্তার কারণে অনেকে চিকিৎসার প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে পারেননি।’
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে দুই হাজারের বেশি আহত ব্যক্তি স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। আমরা প্রায় ছয় হাজার ৪০০ জনকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছি। কিন্তু জীবিকার ব্যবস্থা করা গেছে মাত্র ১৫০টি পরিবারের। এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন চিকিৎসা নয়, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান। মানসিক ট্রমা মোকাবেলার ব্যবস্থাও আরো জোরদার করতে হবে।’
কামাল আকবর বলেন, “২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের দুই দিন পর ১০ আগস্ট ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ গঠন করা হয়। সেই সময় আহতদের ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’ হিসেবে জরুরি সহায়তা দিতে গঠন করা হয় জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন। অন্তর্বর্তী সরকারের ত্রাণ তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া অনুদান ১২২ কোটি টাকা থেকে ৮৩১ জন শহীদ পরিবারকে পাঁচ লাখ করে দিয়েছি আমরা। আর ছয় হাজার ১২৭ জন আহতকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৭৮ কোটি টাকাসহ সর্বমোট ১১৭.৫ কোটি টাকা জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তা থেকে এটি সম্পূর্ণ আলাদা।”
তিনি বলেন, ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরে দৃষ্টিশক্তি হারানো ৪৩ জন এবং দুই হাজার পঙ্গু জুলাই যোদ্ধা সরকারি চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে নিরুপায় হয়ে ফাউন্ডেশনের শরণাপন্ন হন। আমরা ওই সময় এঁদের চিকিৎসা বাবদ তিন কোটি টাকা ব্যয় করেছি। এখন প্রয়োজন একটি ডে কেয়ার ও ট্রমা হিলিং সেন্টার স্থাপন। দূরবর্তী অঞ্চল থেকে চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে আসা গুরুতর আহতদের জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স ও অস্থায়ী রাত যাপনের ব্যবস্থা করা দরকার। এ ছাড়া জরুরি ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অপারেশন বাবদ অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন।’
ভাতার চেয়ে চিকিৎসা ব্যয় বেশি : নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোডে ২০ জুলাই পুলিশের গুলিতে আহত হন রাকিব। পরে পঙ্গু হাসপাতালে তাঁর বাঁ পা কেটে ফেলতে হয়। একসময় সেলুনে কাজ করা রাকিব এখন বাবার ছোট দোকানে বসেন। ব্র্যাকের দেওয়া কৃত্রিম পা ব্যবহার করলেও আগের মতো কাজ করতে পারেন না তিনি।
রাকিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এককালীন অনুদান হিসেবে তিন লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। পেয়েছি দুই লাখ টাকা। মাসিক ১৫ হাজার টাকার ভাতাও কয়েক মাস ধরে বন্ধ। চিকিৎসা, ওষুধ আর যাতায়াতেই ভাতার চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে।’
মিরপুর-২ মডেল থানার সামনে ৫ আগস্ট গুলিতে ডান পা হারান নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তামিম। ব্র্যাক থেকে কৃত্রিম পা পেলেও সেটি ব্যবহার করতে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। ক্ষতস্থান ফুলে যাওয়ায় গত দুই মাস প্রায় ঘরবন্দি। কালের কণ্ঠকে তামিম বলেন, ‘পঙ্গু হাসপাতালে নিয়মিত যেতে হয়। কিন্তু এখন আর আগের মতো সময় দেন না চিকিৎসকরা। অনেক সময় সমস্যার কথা বলার সুযোগও পাওয়া যায় না।’
কারওয়ান বাজারে গুলিবিদ্ধ হয়ে দুই দৃষ্টিশক্তি হারান সাব্বির আহমেদ। একসময় করপোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। এখন ব্রেইল ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন জীবন শুরুর চেষ্টা করছেন। চার মাস বয়সী সন্তান নিয়ে তাঁর সংসার চলছে মাসিক ২০ হাজার টাকার সরকারি ভাতায়। সাব্বির বলেন, ‘ভাতা নয়, আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কর্মসংস্থান। আমরা কাজ করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই।’
চিকিৎসকদের মতে, যাঁরা অঙ্গ হারিয়েছেন, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রেই একাধিকবার কৃত্রিম অঙ্গ পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের ক্ষেত্রে শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে কৃত্রিম অঙ্গ লাগতে পারে। ফলে চিকিৎসা শুধু অস্ত্রোপচারেই শেষ হচ্ছে না; এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) পরিচালক ডা. আবুল কেনান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আহতদের অনেকে এখনো নিয়মিত ফলোআপের জন্য হাসপাতালে আসছেন। বিশেষ করে যাঁদের আগে অস্ত্রোপচার করে হাড়ের জোড়ায় স্ক্রু বা রিং লাগানো হয়েছিল, হাড় জোড়া লাগার পর এখন সেগুলো খোলার কাজ চলছে।’
তিনি বলেন, ‘গুরুতর জখমের কারণে যাঁদের হাড় বা মাংসপেশিতে গ্যাপ তৈরি হয়েছে, তাঁদের এক্সটারনাল ফিক্সেটর (লোহার খাঁচার মতো রিং) পরানো হয়েছে। এই রোগীদের হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন নেই; বরং হাঁটাহাঁটি করলে তাঁদের হাড় দ্রুত জোড়া লাগতে সুবিধা হবে।’
ডা. আবুল কেনান বলেন, ‘চিকিৎসাধীন ২১ জনের অঙ্গহানি হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জন পা এবং তিনজন হাত হারিয়েছেন। তাঁদের কৃত্রিম অঙ্গ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা বর্তমানে সেগুলো ব্যবহার করছেন। কোনো বিশেষ সমস্যা বা যান্ত্রিক জটিলতা না দেখা দিলে তাঁদের খুব বেশি হাসপাতালে আসতে হয় না।’
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চোখে ছররা গুলিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে প্রায় এক হাজার জন আহত ব্যক্তি হাসপাতালে এসেছেন। এঁদের মধ্যে ১১ জন দুই চোখ হারিয়েছেন। এক চোখ হারিয়েছেন ৪৯৩ জন। দুই চোখের আংশিক দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন ২৮ জন আর এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন ৪৭ জন। এই রোগীদের নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসা নিতে হয়। কারণ, এখনো চোখের ইনফেকশনের ঝুঁকি রয়ে গেছে। প্রতিদিন কমবেশি ১০ জন আসছেন চিকিৎসা নিতে।’
যাচাই-বাছাইয়ে বাদ ২১৯ ‘জুলাই যোদ্ধা’ : সরকারের যাচাই-বাছাইয়ে ২১৯ জন ‘জুলাই যোদ্ধা’র পরিচয় বাতিল করা হয়েছে। ১৩ জনের ‘শহীদ’ পরিচয়ও গেজেট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আরো ২৩ জন শহীদের বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ ফারুক হোসেন।
তিনি বলেন, ‘গেজেটভুক্ত মোট শহীদ ৮৫৬ জন থেকে যাচাই-বাছাই শেষে ১৩ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে গেজেটভুক্ত শহীদ ৮৪৩ জন।’
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শাখার উপসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম জানান, আহতদের চিকিৎসা, মাসিক ভাতা, এককালীন অনুদান, বিদেশে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন খাতে এ পর্যন্ত ৯৭৩ কোটি ৩৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশে চিকিৎসা ব্যয় হয়েছে ৩০০ কোটি টাকার বেশি। বিদেশে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫৪ জন। তাঁদের মধ্যে ১০৬ জন থাইল্যান্ড, ৪০ জন সিঙ্গাপুর, সাতজন তুরস্ক এবং একজন রাশিয়ায় চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে ৩৯ জন থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন।
ডা. মো. জহিরুল ইসলাম জানান, আহতদের মধ্যে ৯৯০ জন ‘ক’, এক হাজার ৪১৭ জন ‘খ’ এবং ১১ হাজার ৯৬৩ জন ‘গ’ ক্যাটাগরির ভাতাভোগী। সব মিলিয়ে ১৪ হাজার ৩৭০ জন মাসিক ভাতার আওতায় রয়েছেন।
সরকারের পরিকল্পনা : সম্প্রতি আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত জুলাই জাতীয় সম্মেলনে এক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের যথাযথ মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। তাঁদের হত্যাকারীদের বিচারও এ দেশের মাটিতেই হবে।
তিনি বলেন, ‘জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আহতদের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁদের পরিবার ও যোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান, স্বীকৃতি ও জীবনমান নিশ্চিতকরণ, পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রদানে সরকার কাজ করছে।’