Image description
বিএনপির এমপি ফজলুর রহমানকে পাগল বলা গুরুতর অন্যায়। কারণ তিনি খুবই বুদ্ধিমান মানুষ। এর উদাহরণ হল, সংসদে ভোট দেওয়ার সময় এবং টকশোতে তিনি পুরাই উল্টা মানুষ। উনি বক্তৃতায় পুলিশ হত্যার বিচার দাবি করলেও, সংসদে যখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দায়মুক্তি আইন পাস হয়, তখন তিনি পক্ষে ভোট দেন। কারণ বিপক্ষে ভোট দিলে, এমপি পদ চলে যাবে।
চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরে সমালোচিত সাক্ষাতকারে তিনি দাবি করেছেন, জুলাইয়ে পুলিশ হত্যা হাজার দিয়ে হিসাব করতে হবে। যদিও জাতিসংঘ, সরকার, পুলিশের হিসাবে সংখ্যাটি ৪৪। তাদের নাম পরিচয় প্রকাশিত। ৪১ জনরের পরিবারকে সরকার ক্ষতিপূরণ দিয়েছে (বাকি তিনজনের উত্তারাধিকারী জটিলতায় ক্ষতিপূরণ আটকে আছে)। এই ৪৪ জনের বাইরে কোনো পুলিশ নিহত হয়েছে, এমন দাবি, অভিযোগ, প্রমাণ নেই।
 
আওয়ামী লীগ একটি তালিকা করেছিল। সেখানেও নিহত পুলিশ সংখ্যা ৪৪। যদিও ভাষণে দাবি করে ৩২০০। সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ফজলুর রহমান একই বয়ান চালিয়ে দিতে চাইছেন। জুলাইয়ে কত ছাত্র-জনতা নিহত হয়েছেন, তা তিনি জানেন না। পরিসংখ্যা দিলে, মানতে চান না। ডিনাই করেন। কিন্তু পুলিশের প্রাণহানীর সংখ্যাকে হাজার দাবি করার সময় তিনি সবজান্তা হয়ে উঠেন।
২.
 
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশ হত্যার বিচার কী হবে- এই সংক্রান্ত অধ্যাদেশ অন্তর্বর্তী সরকার জারি করে। যা গত ৮ এপ্রিল সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। ফজলুর রহমান কী করেন, তা দেখার জন্য দৌড়ে সেদিন গ্যালারিতে যাই। গিয়ে দেখি ওমা! তিনি অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করতে হাত তুলে হ্যাঁ ভোট দিচ্ছেন!
জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) আইন, ২০২৬ এ বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানে অভ্যুত্থানকারীদের প্রতিরোধে কোনো পুলিশ সদস্যের প্রাণ গেলে, বিচার হবে না। কিন্তু কোনো অভ্যুত্থানকারীরা যদি পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো পুলিশকে হত্যা করে থাকে, তাহলে বিচার হবে।
নিহত পুলিশ সদস্যেল পরিবার মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ দিতে পারবে। যদি প্রাথমিক তদন্তেও পাওয়া যায়, গণঅভ্যুত্থানের সময়ে গুলির মুখে পড়ে আত্মরক্ষা প্রতিরোধে নয়, অপরাধমূলকভাবে পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে, তাহলে আদালতে মামলা হবে, প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ সাজা হবে। আর প্রতিরোধে কারো প্রাণ গেলে সেই পুলিশ সদস্যের পরিবার শুধু ক্ষতিপূরণ পাবে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিরোধে কারো প্রাণ গেলে একইরকম দায়মুক্তি দিয়ে ১৯৭২ আদেশ জারি হয়েছিল। পরে যা আইনে পরিণত হয়।
ফজলুর রহমান সাহেব জুলাই দায়মুক্তি আইনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন সংসদে। কিন্তু টকশোতে এসে বলেন, বিচার চাই। এটা তো ভন্ডামি। ভন্ডরা পাগল হয় না।
৩.
 
ফজলুর রহমান আওয়ামী লীগ ছাড়েন শুধুমাত্র এবং কেবলমাত্র সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে বিরোধে। সমবয়সী হয়েও তিনি জীবনেও জন্মভূমি কিশোরগঞ্জ-৪ থেকে এমপি হতে পারেননি আবদুল হামিদের কারণে।
 
১৯৮৬ সালে ফজলুর রহমানকে তৎকালীন কিশোরগঞ্জ-৩ (এখন যেটা কিশোরগঞ্জ-১) আসনে পাঠায় আওয়ামী লীগ। বিএনপিবিহীন ছিয়াশির ভোটে জিতলেও ১৯৯১ সালে ওই আসনে হের যান। ১৯৯৬ সালে নির্বাচন করেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
 
ফলে ফজলুর রহমানের এমপি হওয়ার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। এতে তিনি বিদ্রোহ করেন। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে আবদুল হামিনের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে অল্প ভোটে হেরে যান। তখন থেকেই তিনি দাবি করছেন, আবদুল হামিদ তাঁকে কারচুপি করে হারিয়েছে। এই নির্বাচনের কারণে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার হন।
১৯৯৯ সালে তৎকালীন কিশোরগঞ্জ-১ আসনের এমপি শামসুল হকের মৃত্যুতে আসনটি শূন্য হলে, ফজলুর রহমান মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তখন আবদুল হামিদ এবং সৈয়দ আশরাফ মিলে তা হতে দেননি। এ ক্ষোভ থেকেই ফজলুর রহমান যোগ দেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগে। ২০০১ সালে গামছা প্রতীকে আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে হেরে যান অল্প ভোটে। ২০০৮ সালে বিএনপি থেকে নির্বাচন করে আবারও হারেন আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে।
 
ফজলুর রহমান প্রায়ই বলেন, আবদুল হামিদ তাঁর জীবনের ৪০টা বছর নষ্ট করে দিয়েছে। ২০০৯ সালের পর বিএনপি নেতারা সব দৌড়ের ওপর থাকলেও, ফজলুর রহমান ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে মাত্র মামলার আসামি হয়ে হাজত বাস করেছেন। তা রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সম্পর্কে কুকথা বলার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা। উনার হলফনামা দেখতে পারেন। ১৯৭০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আর বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা নেই।
৪.
ফজলুর রহমান বিএনপিতে এসেছিলেন এমপি হতে। সেটার জন্যই আছেন। আবদুল হামিদের কাছে 'কোনঠাসা' না হলে, তিনি আওয়ামী লীগ ছাড়তেন না।
এ কারণেই ফজলুর রহমান আওয়ামী লীগের ভাষায় জুলাই ষড়যন্ত্র, কালোশক্তি ব্লা ব্লা ব্লা বলেন। বিএনপির পার্টি লাইনের সঙ্গে যা মেলে না। বিএনপি লাইনের বাইরে গিয়ে বলেন, ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার চুক্তিতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়নি। আবার বিএনপিও ছাড়েন না। বিএনপিও তাকে এনডোর্স করে, কারণ এতে এই ধারার লোকজনকে অ্যালাইন করা যায়। পাগল বা আদর্শিক অবস্থানে থাকলে তো জুলাইয়ের দায়মুক্তির বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে এমপি পদ ছেড়ে দিতেন।
তো যে লোক এত পরিষ্কার রাজনীতিটা বোঝেন, তাকে পাগল বলা অন্যায়। যারা বলে তারা পাগল।