Image description

টানা ভারি বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে চট্টগ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীসহ বিভিন্ন উপজেলার লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্বিষহ সময় পার করছেন। কোথাও কোথাও কবরস্থান ডুবে যাওয়ায় মৃতদের লাশ দাফনেও দেখা দিয়েছে চরম সংকট। দুর্গম এলাকায় যাচ্ছে না ত্রাণ।

জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল পর্যন্ত জেলার প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ২২ হাজার ১০০ জন। এ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

সরকারি নির্দেশনায় উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, এনজিও এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকলেও দুর্গত মানুষের অভিযোগ, অধিকাংশ ত্রাণ মূল সড়ক ও সহজে পৌঁছানো যায় এমন আশ্রয়কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ। ফলে পানিবিচ্ছিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামের বহু পরিবার এখনো খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে দিন কাটাচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাক, পিকআপ ও ছোট যানবাহনে ত্রাণ এলেও নৌকার অভাব, প্রবল স্রোত, ভাঙা সড়ক এবং দুর্গম এলাকার পথ না জানার কারণে স্বেচ্ছাসেবীরা অনেক ক্ষেত্রে ভেতরের গ্রামগুলোতে পৌঁছাতে পারছেন না। এতে সড়কসংলগ্ন এলাকায় একই ব্যক্তি একাধিকবার ত্রাণ পেলেও দুর্গম অঞ্চলের অনেক পরিবার এখনো কোনো সহায়তা পায়নি।

সাতকানিয়ার কাঞ্চনা, ছদাহা, এওচিয়া, কেঁওচিয়া ও চরতি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বুক থেকে গলা সমান পানি জমে রয়েছে। অনেক পরিবারের ঘরবাড়ি ডুবে গেছে এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক দিন ধরে তারা শুকনো খাবার, নিরাপদ পানি ও ওষুধের অপেক্ষায় রয়েছেন।

দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান বলেন, “দলের পক্ষ থেকে সব এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে কিছু গ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগছে।”

একই ব্যক্তি একাধিকবার ত্রাণ পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন আলাদাভাবে ত্রাণ বিতরণ করায় এমনটি হচ্ছে। এছাড়া প্রত্যন্ত এলাকার সঠিক অবস্থান না জানার কারণেও অনেক গ্রাম এখনো বঞ্চিত রয়েছে।”

লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর প্লাবিত এলাকাগুলো থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য দুধ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের তীব্র সংকটের কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন জানান, এখন পর্যন্ত ১০০ টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে এবং তা নিয়ম অনুযায়ী বিতরণ করা হচ্ছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় সবাইকে একসঙ্গে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, “বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন ও ব্যক্তি যেন প্রত্যন্ত গ্রামে ত্রাণ পৌঁছে দিতে পারেন, সে জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।”

বাঁশখালীর বাসিন্দা আকিব বলেন, অনেক ত্রাণদল শুধু সড়কসংলগ্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করে ফিরে যাচ্ছে। ফলে সহজে যাওয়া যায় এমন এলাকার মানুষ একাধিকবার সহায়তা পেলেও ভেতরের গ্রামগুলোর মানুষ না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

তিনি আরও জানান, অধিকাংশ নলকূপ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু, বয়স্ক, অসুস্থ ব্যক্তি ও গর্ভবতী নারীরা।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘স্বপ্নযাত্রী’র কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রুবেল মাহমুদ বলেন, “অনেক সংগঠন মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করেই ফিরে যাচ্ছে। নৌকার সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া এবং স্থানীয় গাইডের অভাবে দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নৌকার মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বয়ে যেসব এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছেনি, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধ সরবরাহ করা হবে।

বন্যায় কবরস্থানও পানির নিচে

সাতকানিয়া উপজেলার অনেক এলাকায় কবরস্থানও বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় লাশ দাফন নিয়ে চরম দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। কেঁওচিয়া ইউনিয়নের অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফোরকান গত শুক্রবার মারা গেলে পরিবারের সদস্যরা তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করতে পারেননি।

স্বজনরা জানান, বসতবাড়ি ও কবরস্থান কোমরসমান পানির নিচে থাকায় লাশ একটি ভেলায় করে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে শুকনো স্থানে নেয়া হয়। পরে সেখান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের দস্তিদারহাট এলাকায় গোসল, কাফন ও জানাজা সম্পন্ন করা হয়। শেষে পারিবারিক কবরস্থানের পরিবর্তে পাশের একটি পাহাড়ের সরকারি খাসজমিতে তাকে দাফন করা হয়।

ফোরকানের ছেলে রাসেল উদ্দিন বলেন, “বাবার শেষ ইচ্ছা ছিল পারিবারিক কবরস্থানে দাফন হওয়ার। কিন্তু বন্যার কারণে সেই ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হয়নি।”

কেঁওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মহসিন বলেন, “ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা এখনো পানির নিচে থাকায় মরদেহ দাফনের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, এই ঘটনা চট্টগ্রামের চলমান বন্যার ভয়াবহতার একটি মর্মস্পর্শী উদাহরণ।”

শীর্ষনিউজ