Image description

প্রায় চার মাস ধরে চেয়ারম্যান ও তিন কমিশনার ছাড়াই চলছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ফলে অনুসন্ধান শুরু, মামলা দায়ের, চার্জশিট অনুমোদন, সম্পদ জব্দ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, গ্রেফতারি কার্যক্রমসহ কমিশনের অনুমোদননির্ভর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কমিশনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় শতাধিক অভিযোগ, একাধিক অনুসন্ধান, মামলা। আটকে আছে গুরুত্বপূর্ণ সব চার্জশিট।

দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, কমিশন না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম চললেও আইন অনুযায়ী যেসব সিদ্ধান্ত কমিশনের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয় সেগুলো এগোচ্ছে না। এতে আলোচিত বহু দুর্নীতি মামলার অগ্রগতি থেমে রয়েছে।

আইন ও বিধি অনুযায়ী কমিশনের রুটিন কার্যক্রম চলছে। তবে যেসব বিষয়ে কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে- দুদকের মুখপাত্র ও উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম

গত ৩ মার্চ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই বিদায় নেয়। এরপর থেকেই চেয়ারম্যান ও কমিশনারশূন্য হয়ে পড়ে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ চার মাসেও নতুন কমিশন নিয়োগ না হওয়ায় কার্যত অভিভাবকহীন অবস্থায় রয়েছে দুদক।

তবে নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গত ২২ জুন দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে সভাপতি করে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। এরই মধ্যে সাবেক আমলা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বিচার বিভাগের কয়েকজন ব্যক্তির নাম সম্ভাব্য কমিশনার হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

 

দুদকের মুখপাত্র ও উপ-পরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, আইন ও বিধি অনুযায়ী কমিশনের রুটিন কার্যক্রম চলছে। তবে যেসব বিষয়ে কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।

অনুমোদনের অপেক্ষায় পি কে হালদারের আরও মামলা

দুদকের একাধিক সূত্র জানায়, আলোচিত পি কে হালদারসংশ্লিষ্ট একাধিক মামলাও কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড থেকে অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির অভিযোগে আরও প্রায় ১৩টি মামলা প্রক্রিয়াধীন। এর মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়টি মামলা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব মামলায় আত্মসাতের অভিযোগের পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তদন্ত কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, পি কে হালদারের দুটি প্রতিষ্ঠান—ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড এবং ফাস ফাইন্যান্সের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে অর্ধশতাধিক মামলা হয়েছে। অনেক মামলার চার্জশিট দেওয়া হলেও আরও কয়েকটি চার্জশিট ও নতুন মামলা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

প্রশান্ত কুমার হালদার, যিনি পিকে হালদার নামে পরিচিত, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নামে-বেনামে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে ২০২০ সালে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে ২০২২ সালের মে মাসে ভারতে গ্রেফতার হন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আলোচনা হলেও এখনো প্রত্যর্পণ সম্ভব হয়নি।

২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের মামলায় ঢাকার একটি আদালত তাকে মোট ২২ বছরের কারাদণ্ড দেন। একই মামলায় অন্য ১৩ আসামিকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

সাইফুজ্জামান জাবেদের বিরুদ্ধে আরও অনুসন্ধান

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগেও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। দুদক এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে ৩০টি মামলা করেছে এবং দুটি মামলার চার্জশিট প্রস্তুত করেছে। এছাড়া ইউসিবি ব্যাংক ও আরমিট গ্রুপ থেকে কথিত কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে নতুন অনুসন্ধান চলছে।

এক তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় ফরেনসিক তথ্য ও নথি পেতে সময় লাগছে। একই সঙ্গে কমিশন না থাকায় চার্জশিট অনুমোদনসহ অনেক সিদ্ধান্তও আটকে আছে।

তিনি জানান, দেশের আদালত এরই মধ্যে দেশে-বিদেশে থাকা সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নতুন অনুসন্ধানের অপেক্ষা

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে দুদক এখন পর্যন্ত ২১টি মামলা করেছে। এর মধ্যে সাতটি মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। পূর্বাচলে প্লট জালিয়াতির ছয়টি মামলার রায় হয়েছে এবং একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, কমিশন না থাকলেও তদন্ত ও তথ্য সংগ্রহের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে কমিশনের অনুমোদন ছাড়া মামলা, চার্জশিট, অনুসন্ধান শুরু, সম্পদ জব্দ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

দুদক সূত্র জানায়, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে আরও ১৬ মামলার প্রস্তুতি

বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধেও বড় ধরনের অনুসন্ধান চলছে। তার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে ১১টি মামলা হয়েছে। তবে এখনো কোনো মামলার চার্জশিট অনুমোদন হয়নি।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, এসব মামলায় প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আরও ১৬টি নতুন মামলা প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ আনার প্রস্তুতি রয়েছে। তবে কমিশনের অনুমোদন না থাকায় সেগুলোও আটকে আছে।

অনুমোদনের অপেক্ষায় আরও আলোচিত মামলা

দুদক সূত্র জানায়, শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা আর্থিক খাত নয়, আরও বেশ কয়েকটি আলোচিত তদন্তও কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিটিসিএলের ফাইভ-জি প্রকল্পে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নিলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।

এছাড়া করোনা মহামারির সময় চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিকসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা দায়েরের সুপারিশও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, কমিশন না থাকলেও তদন্ত ও তথ্য সংগ্রহের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে কমিশনের অনুমোদন ছাড়া মামলা, চার্জশিট, অনুসন্ধান শুরু, সম্পদ জব্দ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।