বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে প্রায় অর্ধযুগ আগে বড় পদক্ষেপ নিয়েছিল ঢাকার দুই সিটি কর্তৃপক্ষ। ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ওয়াসার কাছ থেকে নিয়ে নেয় প্রায় ৮০ কিলোমিটারের ২৬টি খাল এবং ৩৮৫ কিলোমিটারের বড় নালা। এরপর জলাবদ্ধতা নিরসনের আশ্বাসে পার হয়েছে পাঁচ বছরের বেশি সময়। এর মধ্যে দুই সিটির মেয়র বদলেছে, সরকার বদলেছে, এমনকি পদক্ষেপ ও কর্মসূচিতেও এসেছে অনেক পরিবর্তন।
তাতে ফল কী হয়েছে? জলজটের চিত্র বদলায়নি বলে অভিযোগ রাজধানীবাসীর। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এবার ঢাকার গড় বৃষ্টিপাতের রেকর্ড ভাঙার শঙ্কা রয়েছে। ফলে আবারও ডুবতে পারে ঢাকা।
গতকাল রবিবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৬ ঘণ্টায় রাজধানীতে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৮২ মিলিমিটার। আর সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ছিল ৯৭ মিমি। এতেই ডুবেছে ঢাকার দুই সিটির বিস্তীর্ণ এলাকা। জলমগ্ন হয়ে পড়েছে দোকানপাট, সড়ক; যা কার্যত স্থবির করে দিয়েছে কোটি মানুষের জীবন।
প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমকে কেন্দ্র করে জলাবদ্ধতার হটস্পট নির্ধারণ করে দুই সিটি কর্তৃপক্ষ। এবারও ১৪১টি হটস্পট শনাক্ত করে সংস্থা দুটি। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) চিহ্নিত করেছে নিউ মার্কেট, নায়েম সড়ক, গ্রিন রোড, শান্তিনগর, মুগদা মেডিকেল, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, পুরান ঢাকা, মাজেদ সরদার রোড, পশ্চিম মালিবাগ, রাজারবাগসহ মোট ৩৩টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ হটস্পট।
অন্যদিকে ১০৮টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ হটস্পট চিহ্নিত করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এর মধ্যে বিমানবন্দর রোড, খিলক্ষেত, ব্যাপারীপাড়া, মধ্যপাড়া, নামাপাড়া, কুড়িল, কালশী রোড, মিরপুর-১২-এর মুসলিম বাজার, মিরপুর-১০ গোলচত্বর, মিরপুর-১১-এর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে, শাহীনবাগ, বিজয় সরণি অন্যতম। তবে জলাবদ্ধতাকে বাধা যায়নি এসব হটস্পটে। এর বাইরেও তলিয়ে গেছে বহু এলাকা। এই জলজটের উচ্চতা ছিল এলাকাভেদে ৮ ইঞ্চি থেকে আড়াই ফুট পর্যন্ত, যা নিরসনে নাকানিচুবানি খাচ্ছে সংস্থাটির প্রশাসক থেকে শুরু করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
ডিএনসিসির অবস্থা আরও ভয়াবহ। বনানীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার র্যাম্পের গোড়ার বিশাল জলরাশি দেখে যে কেউ একে সমুদ্র ভেবে ভুল করবে। একই রকম অবস্থা বিমানবন্দর সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টের। পুরো বর্ষাকালের বৃষ্টিপাতে হয়তো এখানে একসময় বিমানের পরিবর্তে জাহাজ ভেড়ানোর জেটি বানাতে হবে সরকারকে।
রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকার দুই সিটির স্থায়ী পাম্প আটটি। এর মধ্যে তিনটি ডিএসসিসির। এসব পাম্পের মাধ্যমে সংস্থাটি জলাবদ্ধতার পানি খাল এবং নদীতে ফেলে। কমলাপুর টিটিপাড়া, ধোলাইখাল ও হাতিরঝিল— এই তিনটি আউটলেটের মাধ্যমে ১০৯ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন করতে পারে ডিএসসিসি। তবে এবার সংকট অন্যখানে। সংস্থাটি বলছে, ভারী বর্ষণে খাল এবং নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় পাম্প দিয়ে পানি অপসারণে বেগ পেতে হচ্ছে তাদের। ১১টি পাম্প স্টেশন হলে অনেকটা সহজে করা যেত জলাবদ্ধতা নিরসন।
অন্যদিকে ডিএনসিসির জলাবদ্ধতা নিরসনে ১০টি অঞ্চলে কাজ করে ২১টি কুইক রেসপন্স টিম। এ ছাড়া মিরপুর, কল্যাণপুরসহ জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে পাঁচটি স্থায়ী সেচপাম্প সচল। এর বাইরেও তাৎক্ষণিক ও জরুরিভাবে জলাবদ্ধতাপ্রবণ নিচু এলাকাগুলোর পানি সেচের জন্য দুই সিটির কাছেই কিছু পোর্টেবল পাম্প রয়েছে। তবুও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না নগরবাসী।
২০২০ সালের আগ পর্যন্ত ঢাকার ড্রেন, খাল একক কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকলে জলাবদ্ধতা দূর হবে— এমন আশার বাণী বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছিল ঢাকার দুই সিটি। তবে একক দায়িত্ব পাওয়ার পরও খালের নাব্য পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে না পারা এবং ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন করতে না পারার খেসারত প্রতি বর্ষায় দিতে হচ্ছে নগরবাসীকে। এমন খেসারত চলতি বছর আরও দিতে বলে শঙ্কা নগরবাসীর। কারণ, আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে বাংলাদেশে বর্ষাকাল জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর নিয়ে। এর মধ্যে জুলাই মাসে সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়। যেহেতু আজ মাত্র জুলাইয়ের ১৩ তারিখ, ফলে এই মাসে সম্ভাবনা রয়েছে আরও বৃষ্টির।
আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ঢাকায় জুলাই মাসে মোট গড় বৃষ্টিপাত ৩৭৫ মিলিমিটার। এর মধ্যে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রবিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এক দিনে বৃষ্টি হয়েছে ১৭৫ মিলিমিটার। এ ছাড়া আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে এখনো শেষ হয়নি বর্ষাকাল। তাই এ বছর ঢাকার গড় বৃষ্টিপাত রেকর্ড ভাঙতে পারে।’
আবহাওয়াবিদের এই পূর্বাভাস সত্যি হলে সামনে আরও নাজুক হতে পারে ঢাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি। কেন জলাবদ্ধতা বছরের পর বছর জুড়ে দূর করা যাচ্ছে না— প্রশ্ন ছিল নগরবিদ ইকবাল হাবিবের কাছে। তিনি ঢাকার জলাবদ্ধতার জন্য তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন। আগামীর সময়ের কাছে এই নগরবিদ তুলে ধরলেন, ব্লু নেটওয়ার্ক, কঠিন ও তরল বর্জ্য পৃথককরণ এবং সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ— এই তিনটি বিষয় বাস্তবায়ন করলেই শূন্যে নেমে আসবে ঢাকার জলাবদ্ধতা। এখানে ব্লু নেটওয়ার্ক হলো ঢাকার খাল ও নদীর সীমানা চিহ্নিত করে তা উদ্ধার করা। আর ড্রেনে বা জলাশয়ে কঠিন বর্জ্য জমা হওয়াও জলাবদ্ধতার একটি বড় কারণ। তাই এই নগরবিদ সিটি করপোরেশনকে কঠিন ও তরল বর্জ্য পৃথককরণে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সবশেষে তিনি সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ ঢাকার সেবাদানকারী ৯টি সংস্থার সমন্বয়হীনতাকে জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী করেন। এই সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসনে গণসম্পৃক্ততার কথাও তুলে ধরেন এই নগরবিদ।
এদিকে গতকাল সকাল থেকে জলাবদ্ধতার চিত্র দেখতে মাঠে নামেন ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম। তার দাবি, জলাবদ্ধতা নিরসনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সিটি করপোরেশন। তবে ওয়াসা ও তিতাসের কিছু রাস্তা খননজনিত কাজের কারণে পানির নিচে কাজ করতে বেগ পেতে হচ্ছে তাদের।
অন্যদিকে লিখিত বার্তায় ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানের দাবি, জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করেছে সিটি করপোরেশন টিম। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণেই এই জলাবদ্ধতা। কোথাও কোনো জরুরি সমস্যা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট টিমকে জানালেই মিলবে সমাধান।