আজহার মাহমুদ (প্রকৃত নাম নয়) প্রায় এক সপ্তাহ জ্বরসহ কিছু শারীরিক সমস্যা নিয়ে শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। চিকিৎসক তাকে কিছু পরীক্ষা করাতে বলেন। কিন্তু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ল্যাবরেটরি বিভাগ জানায়, এই পরীক্ষগুলোর মধ্যে একটি ছাড়া বাকিগুলো হবে না। সেগুলো বাইরে থাকে করিয়ে আনতে হবে। এক্স-রে, আলট্রাসাউন্ড যন্ত্র অনেকদিন ধরেই নষ্ট, এমনকি অটো অ্যানালাইজারগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আশপাশে তিনটি ক্লিনিক গড়ে উঠেছে। সেগুলোতে সব পরীক্ষাই হয়। তাই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের রোগীদের সেখান থেকেই পরীক্ষা করাতে হয়।
এই চিত্র শুধু জাজিরার নয়, এটি সারা দেশের সাধারণ চিত্র। বাগেরহাটের কচুয়া, মোরেলগঞ্জ উপজেলায়, বরিশালের উজিরপুর, গৌরনদী, পটুয়াখালীর বাউফল, বরগুনার আমতলী, খুলনার বটিয়াঘাটা, কয়রাসহ দেশের প্রায় সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একই অবস্থা। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের সময় দিনাজপুর সদর হাসপাতাল, গাইবান্ধা সদর হাসপাতাল, লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল, আধুনিক সদর হাসপাতাল পঞ্চগড়ের শয্যা সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়। কিন্তু জনবল যেমন বাড়ানো হয়নি, তেমনি বাড়ানো হয়নি চিকিৎসা সরঞ্জাম। ফলে এসব হাসপাতালে পুরোনো যন্ত্রগুলো যেমন বিকল পড়ে আছে, তেমনি নতুন যন্ত্র না কেনায় রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন চিকিৎসাসেবা থেকে।
দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরি সেবার সক্ষমতা কমে যাওয়ায় রোগীদের একটি বড় অংশ বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দ্বারস্থ হচ্ছেন। এতে চিকিৎসা ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি পরীক্ষার মান ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরকারি ল্যাবগুলোর আধুনিকায়ন ও যন্ত্রপাতি হালনাগাদে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর উদ্যোগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক চিকিৎসক, ল্যাবসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার যন্ত্রপাতি অকেজো, পুরোনো কিংবা অপর্যাপ্ত। তাদের দাবি, গত কয়েক বছরে নতুন ল্যাব ইকুইপমেন্ট সংগ্রহের গতি খুবই ধীর থাকায় অনেক পরীক্ষা নিয়মিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রোগীদের বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
অধিদপ্তরের সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষার যন্ত্র সরবরাহে ২০১৬ সালে বড় পরিসরে কেনাকাটা হয়। এরপর ২০১৯ সালেও স্বল্প পরিমাণে কেনাকাটা হয়। তবে এরপর ছয় বছরের বেশি সময় ধরে কোনো কেনাকাটা হয়নি। তিনি বলেন, অটো বা সেমি অটো পরীক্ষার যন্ত্রগুলো মূলত দুই থেকে তিন বছরের বিক্রয়োত্তর সেবার নিশ্চয়তায় সরবরাহ করা হয়। অর্থাৎ তিন বছরের পর থেকে এসব যন্ত্রের কার্যকারিতা কমতে থাকে এবং তারপর অকেজো হয়ে পড়ে। ফলে এসব হাসপাতালে রোগীদের পরীক্ষা নিরাক্ষা করা সম্ভব হয় না।
এ কর্মকর্তা আরও বলেন, বিগত সরকারের আমলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটা তহবিল থেকে জেলা, উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালের কেনাকাটা করা হতো। অন্যদিকে এইচএসএম ওপি থেকে মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালের জন্য এবং পিএমআর ওপি থেকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য কেনাকাটা হতো। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি আপৎকালীন প্রকল্প তৈরি করা হয়েছিল। তবে সেই প্রকল্প থেকে মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনাকাটার বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়। ফলে ওই সময়েও কোনো কেনাকাটা হয়নি, যার প্রভাব পড়েছে সরাসরি রোগীদের ওপরে।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো) ডা. আবু হোসেন মো. মইনুল আহসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কোনো কেনাকাটা হয় না, এটা ঠিক। তবে আমাদের কাছে সবচেয়ে বেশি চাহিদা এসেছে অ্যানেসথেসিয়া যন্ত্রের জন্য। এ ছাড়া রি-এজেন্টের ঘাটতির কারণে অনেক যন্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি, সেই সমস্যার সমাধান করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ল্যাবরেটরিগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু না থাকায় বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর রোগীদের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সুযোগে বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত গড়ে উঠছে অসংখ্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ জনবল এবং মানসম্মত যন্ত্রপাতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীদের বাইরে পরীক্ষা করানোর প্রবণতা বাড়ায় দেশব্যাপী এক ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে রোগীকে নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানোর বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা বা কমিশন দেওয়া-নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সরকারি ল্যাবরেটরিগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে রোগীদের বড় একটি অংশ সরকারি ব্যবস্থাতেই পরীক্ষাসেবা পেতে পারতেন। এতে চিকিৎসা ব্যয় কমবে এবং বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও হ্রাস পাবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. রুহুল ফুরকান সিদ্দিক বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে পরীক্ষা যন্ত্রপাতি থাকা জরুরি। তবে সেটি কিনতে হবে স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে। যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য উপযুক্ত জনবল পদায়নের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রপাতি কেনাকাটা না করায় বেশিরভাগ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে না তার মধ্যে রয়েছে সিবিসি বা রক্তের সম্পূর্ণ পরীক্ষা, শ্বেত রক্তকণিকার ৬টি ভিন্ন রূপ বা ধরন নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা এবং রক্তস্বল্পতা, রক্তের ক্যানসার শনাক্তকরণ স্লাইড মার্কারের মাধ্যমে অস্বাভাবিক রক্তের স্লাইড স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করা। রক্তের হরমোন, ক্যানসার মার্কার এবং সংক্রামক রোগ নির্ণয়, থাইরয়েড পরীক্ষা, প্রজনন হরমোন, ক্যানসার মার্কার, সংক্রামক রোগ, কার্ডিয়াক মার্কার বা হার্ট অ্যাটাক নির্ণয়। লিভার ফাংশন, কিডনি ফাংশন, লিপিড প্রোফাইল বা রক্তের চর্বি, মেটাবলিক প্যানেল ইত্যাদি পরীক্ষা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ পর্যবেক্ষণ, বিগত ২-৩ মাসের রক্তের গড় শর্করার বা গ্লুকোজের পরিমাণ নির্ণয়, থ্যালাসেমিয়া বা হিমোগ্লোবিনের অস্বাভাবিকতা নির্ণয়, শরীরে কোনো ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ আছে কি না তা দ্রুত জানা, রক্ত থিতানোর হার পরীক্ষা, যক্ষা, বাতজ্বর বা যে কোনো দীর্ঘমেয়াদি ইনফেকশন ট্র্যাকিং। প্রস্রাবের রাসায়নিক ও মাইক্রোস্কোপিক উপাদান পরীক্ষা করা, প্রস্রাবে পুঁজ, রক্ত, অ্যালবুমিন, গ্লুকোজ বা পাথরের কণা শনাক্তকরণ, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা প্রস্রাবের ইনফেকশন নির্ণয়। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা এবং অ্যাসিড-ক্ষারের ভারসাম্য পরিমাপ, ধমনির রক্ত পরীক্ষা, রক্তে অক্সিজেনের আংশিক চাপ এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের চাপ, রক্তের পিএইচ মাত্রা এবং বাইকার্বোনেট পরীক্ষা। আইসিইউ বা সিসিইউতে থাকা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ফুসফুস ও কিডনির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ। মলের বিভিন্ন উপাদান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরীক্ষা, মলে কৃমির ডিম বা পরজীবী শনাক্তকরণ বা মলে লুকিয়ে থাকা রক্তের উপস্থিতি নির্ণয় করা।