প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে নজর গোটা এশিয়ার। তিনি বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং এবং ২৬ জুন (শুক্রবার) প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এই সফরে আবার সামনে এসেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য চীনের তৈরি আধুনিক ‘জে-১০সিই’ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সফরে তাঁর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিরক্ষা ইস্যুতে চীনের সঙ্গে গভীর আলোচনার প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় কেনাকাটা ইস্যুতে প্রতিরক্ষা খাতের যে কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। সফরে চুক্তি না হলেও যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা অনেকটা এগোবে।
গত ২০ জুন সফর-সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, ‘সামরিক কেনাকাটার বিষয়ে আলোচনা কর্মকর্তা পর্যায়ে হয়ে থাকে। সামরিক ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ এবং দ্বিপক্ষীয় একটা সম্পর্ক রয়েছে। ক্রয়-বিক্রয় করব কিনা, লিডারশিপ পর্যায়ে ওগুলো আসলে যে আলোচনা হয় (তা না), সেগুলো অপারেটিভ লেভেলে হয়। নিশ্চয় আমরা দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতা যেটা আছে, সেটা নিয়ে আলোচনা করব।’
প্রতিরক্ষা ইস্যুতে চীনের সঙ্গে গভীর আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। প্রতিরক্ষার আলোচনায় নানা বিষয়ের মধ্যে কেনাকাটার বিষয়টি আসতেও পারে। প্রতিরক্ষার খাতিরে যে কোন বিষয় এই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
আগেও প্রতিরক্ষা খাতের আলোচনা উঠেছে। গত ১৮ জুন সাংবাদিকদের কর্মশালায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছিলেন, ‘সামগ্রিকভাবে চীন সফর বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বিনিয়োগ না, এর বাইরে প্রতিরক্ষা থেকে আরও অনেক বিষয় উঠে আসবে। রাজনৈতিক বিষয়ও আসবে।’
বিমানবাহিনীর জন্য আধুনিক ফাইটার জেট কেনার আলোচনা আনুষ্ঠানিক রূপ পায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। ২০২৫ সালের মার্চে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীন সফরে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বিমানবাহিনীর জন্য এই যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন।
ওই বছরের এপ্রিলে বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি হয়। কমিটির দায়িত্ব ছিল আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করা। একই বছরের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জানিয়েছিলেন, আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে তারা ২০টি জে-১০সিই জঙ্গি বিমান কেনার পরিকল্পনা করছেন।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান ২০২৪ সালের নভেম্বরে চীন সফর করেন। তিনি চীনের ‘ঝুহাই এয়ার শো’ এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাটিক’-এর সদর দপ্তর পরিদর্শন করেন।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে বর্তমানে ব্যবহৃত চীনের তৈরি এফ-৭ যুদ্ধ বিমানগুলো বেশ পুরোনো। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ নতুন মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ১৬টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
৪.৫ প্রজন্মের জে-১০সিই মাল্টিরোল বিমান একইসঙ্গে প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ– উভয় ক্ষেত্রেই কার্যকরী। এটি অত্যন্ত কম সময়ে এবং স্বল্প রানওয়ে ব্যবহার করে উড্ডয়নে সক্ষম। আকাশ থেকে আকাশে এবং ভূমিতে নিখুঁতভাবে হামলা চালানোর পাশাপাশি এটি রাডারের নজর এড়াতে দক্ষ। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু পাকিস্তানের কাছে চীনের জে-১০সিই যুদ্ধবিমান রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় ভারতের ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর জবাবে পাকিস্তান এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছিল।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চীন সফরে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা এবং একটি প্রটোকল সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২৫ জুন সকালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিডা আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ নামের বিনিয়োগ সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিন বিকেলে চীনের গ্রেট হলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগ দেবেন তারেক রহমান। বৈঠকের পর দুদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হবে। এরপর চীনের প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেবেন তারেক রহমান।
পরদিন ২৬ জুন ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাউ লেজির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎ করবেন। এরপর তারেক রহমান ও সি চিন পিংয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে।
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশদ আলোচনা হবে। ২৬ জুন বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে দেশটির বীর যোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন প্রধানমন্ত্রী। ওইদিন বিকেলেই প্রধানমন্ত্রী বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন।