য়ের পিঁড়িতে বসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু পরিবারের চাপে বাগদান সম্পন্ন হয়েছিল এক কোটিপতি ব্যবসায়ীর ছেলের সঙ্গে। আগামী নভেম্বরেই রাজপ্রাসাদ ও বিমান ভাড়া করে রাজকীয় সেই বিয়ের আয়োজন চূড়ান্ত করা হয়েছিল। তবে বিয়ের এই আয়োজন পছন্দ ছিল না তরুণীর। শেষ পর্যন্ত বিয়ের সম্পর্কের ‘কাঁটা’ উপড়ে ফেলতে হবু বরকে ঘুরতে যাওয়ার বাহানায় পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে গভীর খাদে ফেলে নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন ওই তরুণী ও তার প্রেমিক।
ভারতের মহারাষ্ট্রের পুনের কাছে ঐতিহাসিক লোহাগড় দুর্গে গত ১৮ জুন ঘটা এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী বাগদত্তা তরুণী সিয়া গোয়েল ও তার প্রেমিক চেতন চৌধুরীকে (২২) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আদালত ইতোমধ্যে তাদের ৭ দিনের পুলিশি রিমান্ডের নির্দেশ দিয়েছেন। খবর এনডিটিভির।
তদন্তে নেমে পুনে পুলিশ জানতে পেরেছে, নিহত তরুণ কেতন আগরওয়াল মহারাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর ছেলে। গত ফেব্রুয়ারিতে দুই পরিবারের সম্মতিতে কেতন ও সিয়ার ধুমধাম করে বাগদান হয়। কিন্তু সিয়া মনে মনে এই বিয়েতে মোটেও রাজি ছিলেন না।
কেতনের কাকা পুলিশকে জানান, সিয়া একবার বিয়ের তারিখ অন্তত এক বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য কেতনের পরিবারকে অনুরোধও করেছিলেন। ভেতরের খবর অনুসন্ধান করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, সিয়া নিজে একটি বেকারির মালিক। গত বছর এক ব্যবসায়িক বৈঠকে ড্রাই ফ্রুটস ব্যবসায়ী চেতন চৌধুরীর সঙ্গে তার পরিচয় ও প্রেম হয়। দুই পরিবার যখন রাজকীয় বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত, তখন সিয়া ও চেতন গত ৭ মাসে ফোনে ২ হাজার ৪ বার কথা বলেন। যার মোট সময় ছিল প্রায় ২৩৮ ঘণ্টা। চেতন কোনোভাবেই সিয়া ও কেতনের এই বিয়ে মেনে নিতে পারছিলেন না। ফলে তারা দুজন মিলে কেতনকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত ছক কষেন।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কেতনকে খুন করতে সিয়া একের পর এক চাল চেলেছিলেন। এমনকি তাদের কাছে ‘প্ল্যান এ’ এবং ‘প্ল্যান বি’ ব্যর্থ হলে ব্যবহারের জন্য একটি ‘প্ল্যান সি’-ও তৈরি ছিল। গত মাসে প্রাক-বিয়ে ফটোশুটের জন্য এই যুগলের ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মুম্বাই বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর কেতন দেখেন তার পাসপোর্টটি পাওয়া যাচ্ছে না।
কেতনের বাবার অভিযোগ, সিয়া নিজেই পরিকল্পনা করে পাসপোর্টটি লুকিয়ে রেখেছিলেন যাতে বালি সফর বাতিল হয়। এরপর গত ১৪ জুন সিয়া প্রথমবার ঘুরতে যাওয়ার নাম করে কেতনকে লোহাগড় দুর্গে নিয়ে যান। পাহাড়ের ওপর থেকে ধাক্কা মারেন। কিন্তু কেতন ভাগ্যক্রমে পাহাড়ের খাঁজের একটি ঝোপ আঁকড়ে ধরে বেঁচে যান। সে সময় নিজের অপরাধ ঢাকতে সিয়া ‘ঐ যে সাপ!’ বলে চিৎকার করেন। এরপর কেতনকে জড়িয়ে ধরে ভয়ের নাটক করেন।

প্রথমবার ব্যর্থ হয়ে গত ১৮ জুন আবারও কেতনকে লোহাগড় দুর্গে ঘুরতে যাওয়ার ফাঁদে ফেলেন সিয়া। সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে ছিলেন প্রেমিক চেতন চৌধুরী। সুযোগ বুঝে দুর্গের একটি নির্জন পয়েন্টে কেতনকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে গভীর গিরিখাদে ফেলে দেন তারা। ঘটনাস্থলেই পাথরের আঘাতে কেতনের মৃত্যু হয়। প্রথমে এটিকে সাধারণ পাহাড়ি দুর্ঘটনা মনে করা হলেও পুলিশের খটকা লাগে একটি সিসিটিভি ফুটেজ দেখে। ঘটনার দিন মহারাষ্ট্রের তীব্র ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরমে এক তরুণকে হাফপ্যান্ট এবং মাথা-মুখ সম্পূর্ণ ঢাকা একটি হুডি পরে কেতন ও সিয়ার ঠিক ২০-৩০ ফুট পেছন পেছন হাঁটতে দেখা যায়। অন্য একটি ফুটেজে দেখা যায়, সিয়া পেছনের দিকে তাকাতেই হুডি পরা ওই ব্যক্তি চট করে মাটিতে বসে পড়ে।
এই ক্লু ধরেই তদন্তে নামে পুলিশ। সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, কারিগরি বিশ্লেষণ ও চেতনের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলের ছবির সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ মিলিয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে ওই হুডি পরিহিত ব্যক্তিই সিয়ার প্রেমিক চেতন। এছাড়া হবু বরের আকস্মিক মৃত্যুর পরও সিয়ার আচরণে কোনো শোক বা অনুশোচনা না থাকায় পুলিশ নিশ্চিত হয় যে এটি দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি ঠান্ডা মাথার সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। বর্তমানে এই দুই ঘাতক পুলিশি হেফাজতে রয়েছে।