Image description

আজকের আলোচনায় প্রথমে আমি সাধারণভাবে ফুটবল খেলার বিধান বলব, তারপর পেশা হিসেবে ফুটবল খেলার বিধানের বিষয়ে আসব।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, আপনি যে খেলাই খেলুন না কেন, তা যদি আপনাকে ফিট ও সুস্থ থাকতে সাহায্য করে এবং কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা বিরোধী কোনো কাজের দিকে না নিয়ে যায়, তাহলে তা অনুমোদিত। ফুটবল যদি আপনাকে ফিট ও সুস্থ থাকতে সাহায্য করে এবং কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো কাজের কারণ না হয়, তবে ফুটবল খেলা হারাম নয়।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ফুটবল খেলাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া যাবে কি না? পেশা হিসেবে ফুটবল খেলার ক্ষেত্রে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। কিছু আলেম বলেন যে পেশা হিসেবে ফুটবল খেলাকে বেছে নেওয়া বৈধ নয় এবং এটি হারাম। তাদের মধ্যে একজন বিখ্যাত আলেম হলেন শায়খ মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম। তিনি তাঁর ফতোয়া গ্রন্থের ৮ম খণ্ডের ১১৬ থেকে ১১৯ পৃষ্ঠায় বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করেছেন যে কেন পেশা হিসেবে ফুটবল খেলা হারাম।

তিনি শুরুতেই বলেছেন যে, ফুটবলের পেশাদারিত্বের খুঁটিনাটি বিবরণ না জেনে কারো অধিকার নেই এই বিষয়ে ফতোয়া দেওয়ার যে এটি অনুমোদিত নাকি অনুমোদিত নয়। তিনি এটি হারাম হওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ তালিকাভুক্ত করেছেন। প্রথমত, তিনি বলেছেন, আপনাকে সতরের ব্যাপারে আপস করতে হতে পারে এবং সতর উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, আপনার জামায়াতে নামাজ ছুটে যেতে পারে বা নামাজ কাজা হতে পারে, তাই এটি হারাম। তৃতীয়ত, এতে দলাদলি বা কোন্দল তৈরি হতে পারে। চতুর্থত, এতে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং প্রায়শই মানুষের পা বা হাড় ভেঙে যায়, যে কারণে ফুটবল ম্যাচের সময় সবসময় অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখতে দেখা যায়। পঞ্চমত, অনেক সময় আন্তর্জাতিক সফরে যেতে হয় এবং অমুসলিম দেশে যাওয়ার পর বিভিন্ন হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব কারণে তিনি ফতোয়া দিয়েছেন যে পেশা হিসেবে ফুটবল খেলা হারাম।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

আমি শায়খ মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিমের সাথে অনেকখানি একমত, তবে পুরোপুরি নই। তিনি পেশা হিসেবে ফুটবলের যে স্তরের কথা বলছেন তা অনেক উঁচু পর্যায়ের। বিশ্বমানের ফুটবল খেলোয়াড় হওয়া, বিশ্বকাপ বা ইউরো কাপের মতো শীর্ষ স্তরে খেলার ক্ষেত্রে তার কথা অনেকখানি সঠিক, কিন্তু ঢালাওভাবে ফুটবল খেলাকে পেশা হিসেবে হারাম বলা—এই বিষয়ে আমি তার সাথে দ্বিমত পোষণ করি।

আমি তার ফতোয়ার প্রথম কথার সাথে একমত যে, ফতোয়া দেওয়ার আগে পেশা হিসেবে ফুটবল খেলা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত। আলহামদুলিল্লাহ, আমার এমন অনেক বন্ধু আছেন যারা পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড়। তারা যে টপ লিগে বা আন্তর্জাতিক লিগে, এমনকি জাতীয় লিগে খেলেন তা নয়। পেশাদার ফুটবলার হওয়ার মানেই এটা নয় যে আপনাকে বিশ্বকাপ, অলিম্পিক বা ইউরো কাপে খেলতে হবে। বিশ্বের ফুটবল খেলোয়াড়দের মধ্যে হয়তো ০.১ শতাংশের চেয়েও কম খেলোয়াড় সেই স্তরে পৌঁছায়।

বোম্বেতে থাকার সময় আমার অনেক বন্ধু ছিলেন যারা স্থানীয় বিভিন্ন কোম্পানিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং কোম্পানির হয়ে ফুটবল খেলতেন। তারা কাস্টমস বা রেলওয়েতে যোগ দিয়েছিলেন। এই সেক্টরগুলোতে অনেক সময় খেলাধুলায় ভালো এমন মানুষদের চাকরি দেওয়া হয়। আপনি হয়তো পড়াশোনায় খুব ভালো নন, কিন্তু ফুটবলে ভালো হওয়ার কারণে তারা আপনাকে চাকরি দেয়, প্রশিক্ষণ দেয় এবং আপনাকে একজন পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলে, তবে তা সাধারণ স্তরে খেলার জন্য।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

আপনি কয়েক বছর তাদের হয়ে খেলবেন, তা রেলওয়ে হোক বা ইন্ডিয়ান কাস্টমস, এতে কোনো সমস্যা নেই। সাধারণ স্তরে খেলার ক্ষেত্রে শায়খ ইব্রাহিম যা বলেছেন তার প্রভাব খুবই নগণ্য এবং সাধারণ স্তরে খেলে আপনি সহজেই এসব বিষয় এড়িয়ে চলতে পারেন। সতরের ক্ষেত্রে, আপনি যদি একজন মুসলিম হন তবে আপনি খুব সহজেই বলতে পারেন যে আমি হাঁটু ঢাকা লম্বা শর্টস পরিধান করব। দ্বিতীয় পয়েন্ট হলো নামাজ ছুটে যাওয়া; আমি এমন অনেক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি মুসলিমকে চিনি যারা খেলাধুলার কারণে কখনো নামাজ মিস করেননি। একটি ফুটবল ম্যাচ সাধারণত খুব অল্প সময়ের জন্য হয়—মাঝখানে ছোট বিরতিসহ ৪৫ মিনিট করে সর্বোচ্চ দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। সাধারণত এটি দিনের বেলা বা সন্ধ্যায় খেলা হয় যখন নামাজের জামায়াতের সময় থাকে না, তাই নামাজ মিস হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আর আপনি যদি কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বাস করেন, তবে তারা লক্ষ্য রাখে যেন ম্যাচের সময় নামাজের জামায়াতের সাথে মিলে না যায়। সুতরাং আপনি এ কারণে ঢালাওভাবে ফুটবল খেলা পেশা হিসেবে নেওয়াকে হারাম বলতে পারেন না। বড়জোর মাকরূহ বলতে পারেন, তাতে আমার আপত্তি নেই, কিন্তু হারাম বলা যায় না।

আমি অনেক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজিকে চিনি যারা ফুটবল খেলেন। আবার এমন অনেক ফুটবলার আছেন যারা নামাজ পড়েন না; কিন্তু তারা ফুটবল ম্যাচের কারণে নামাজ পড়েন না এমন নয়। অনেক মুসলিমই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন না বা মসজিদে যান না। আমি কনস্ট্রাকশন ক্ষেত্রে কাজ করা অনেক মানুষকে চিনি যারা কাজের ব্যস্ততায় নামাজ পড়েন না; আপনি কি বলতে পারবেন যে নামাজ না পড়ার কারণে কনস্ট্রাকশন কর্মী হওয়া হারাম? আমি অনেক বিক্রয়কর্মীকে চিনি যারা নামাজ পড়েন না, তাই বলে কি বিক্রয়কর্মী হওয়া হারাম? বিক্রয়কর্মী হওয়া হারাম নয়, সে যদি নামাজ না পড়ে তবে সেটি তার নিজের ভুল। ফুটবলেও আপনি চাইলে জামায়াতের সাথে সব নামাজ পড়ার যথেষ্ট সুযোগ পাবেন। কখনো হয়তো খেলা ও নামাজের সময় মিলে যেতে পারে, তবে সেই সময়ে আপনি আপনার সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারেন এবং বেশিরভাগ কোম্পানিই যদি জানে যে আপনি একজন মুসলিম, তবে তারা আপনার জন্য সময় সামঞ্জস্য করে নেবে। আর যদি না করে, তবে সেই কোম্পানি ছেড়ে দিন। আপনি যদি মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে থাকেন, তবে সেখানে যেসব ম্যাচ হয় তারা লক্ষ্য রাখে যেন নামাজের সময়ের সাথে সংঘর্ষ না হয়।

তাই আমার মত হলো, যতক্ষণ আপনি আপনার সব ফরজ বিধান মেনে চলছেন এবং কোনো হারাম কাজ করছেন না, ততক্ষণ ফুটবল খেলা সম্পূর্ণ ঠিক আছে। সাধারণ স্তরে পেশা হিসেবে ফুটবল খেলাও জায়েজ। আপনি যে কাজই করুন না কেন, তা ফুটবল হোক বা বিক্রয়কর্মী, আপনি যদি নিজের কাজে এত বেশি মগ্ন হয়ে যান যে নামাজই না পড়েন, তবে তার জন্য সেই পেশাকে দোষ দেওয়া যায় না।

বিজ্ঞাপন

তবে এটা ঠিক যে, আপনি যখন উচ্চস্তরে যাবেন, যেমন রাজ্য স্তর বা জাতীয় স্তর, আপনি যত উচ্চস্তরে যাবেন সব ফরজ বিধান মেনে চলা তত বেশি কঠিন হতে পারে। তাই রাজ্য বা জাতীয় স্তরে পেশা হিসেবে ফুটবল খেলাকে সামগ্রীক অবস্থা বিবেচনা করে কেউ মাকরূহ বা হারাম বলতে পারে, সেটি গ্রহণযোগ্য, তবে ঢালাওভাবে যে কোনো স্তরে ফুটবল খেলাকে পেশা হিসেবে নেওয়াকেই হারাম বলা ঠিক নয়।

আমার ছেলেও ফুটবল পছন্দ করে। আমাদের স্কুলে আমরা যেসব খেলাধুলাকে উৎসাহিত করতাম তার একটি ছিল ফুটবল। আমি ক্রিকেট পছন্দ করি না, ক্রিকেট পাঁচ দিন বা পুরো এক দিন ধরে খেলা হয়, এটি একটি বিরক্তিকর খেলা। আমি বলছি না যে এটি হারাম, কিন্তু এটি বিরক্তিকর এবং এতে শারীরিক পরিশ্রম কম। ফুটবলে দেড় ঘণ্টা আপনাকে যেভাবে দৌড়াতে হয়, তাতে যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন তা ক্রিকেটের চেয়ে অনেক ভালো।

তাই আমার স্কুলে আমি কখনো ক্রিকেটকে উৎসাহিত করিনি, ইসলামিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করিনি, কিন্তু স্কুলে উৎসাহিত করিনি। আমরা ফুটবল খেলতে উৎসাহিত করতাম, তবে আমরা ফুটবল খেলাকে পেশা হিসেবে নিতে উৎসাহিত করিনি। আমি কখনোই চাইব না যে, আমার ছেলে একজন পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড় হোক। সে ফুটবল পছন্দ করে, আমরা তাকে উৎসাহিত করেছি এবং আলহামদুলিল্লাহ সে খুব ভালো ফুটবল খেলোয়াড় ছিল, ব্যস এটুকুই। টেলিভিশনে ভিডিও গেম খেলার চেয়ে আমার ছেলে সপ্তাহে এক বা দুই দিন গিয়ে ফুটবল খেলুক, আমি এটিই বেশি পছন্দ করব। ফুটবল ভালো, এটি আপনাকে সুস্থ রাখে এবং এর জন্য স্ট্যামিনা বা শক্তির প্রয়োজন, যা ভালো।

বিজ্ঞাপন

পেশা হিসেবে আমি বলব না যে মুসলমানদের এতে যাওয়া উচিত, তবে তারা যদি সাধরণ স্তরে পেশা হিসেবে ফুটবল খেলে, তবে তা নিশ্চিতভাবেই হারাম নয়। হ্যাঁ, আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে যেন আপনি নামাজ মিস না করেন, আপনার হিজাব বা সতর বজায় রাখেন। সাধারণ স্তরের খেলাকে কেন্দ্র করে সাধারণত জুয়া খেলা হয় না। জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরের ফুটবল খেলায় বাজি ধরা হয় ঠিকই, তবে আপনি যদি নিজে বাজির সাথে জড়িত না থাকেন তবে আপনি গুনাহগার হবেন না।

জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে পেশা হিসেবে ফুটবল খেললে কেন ইসলামের বিধান মানা কঠিন হয়ে পড়ে, সে বিষয়ে আসি। আপনি যখন আন্তর্জাতিক স্তরে যাবেন, যখন আন্তর্জাতিক ক্লাবগুলো যুক্ত হবে, তখন সেখানে প্রচুর টাকা জড়িয়ে পড়ে। শায়খ ইব্রাহিম যা বলেছেন আমি তার সাথে একমত যে সেখানে জুয়া ও বাজি ধরা হয়। কিন্তু আপনি নিজে যদি বাজিতে জড়িত না থাকেন তবে আপনি গুনাহগার হবেন না।

শায়খ ইব্রাহিম আরও বলেছেন, আপনি যখন অন্য কোনো দেশে বা অমুসলিম দেশে সফরে যাবেন, তখন সেখানে অনেক মন্দ বিষয় ঘটতে পারে। কিন্তু আপনি তো ভ্রমণের জন্যও কোনো অমুসলিম দেশে যেতে পারেন, সেটা তো নিষিদ্ধ না। আপনি যদি ভ্রমণের জন্য যেতে পারেন, তবে ফুটবল খেলার জন্য কেন যেতে পারবেন না? ভ্রমণের সময় আপনি যখন কোনো মদের দোকান বা অন্য কিছু দেখেন, তখন আপনি আপনার দৃষ্টি অবনত করেন। একজন মুসলিম ফুটবল খেলোয়াড়ও যখন কোনো অমুসলিম দেশে যাবে, যদি কোনো অশ্লীল কিছু দেখে, তবে দৃষ্টি অবনত করবে, অন্যরা কী করছে তার জন্য তো আপনাকে হারাম কাজ করতে বলা হচ্ছে না। আমি জানি এমন অনেক খেলোয়াড় আছেন যারা মদ পান করেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনাকেও মদ পান করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক স্তরে যখন আপনি যান, আপনি যেহেতু একজন তারকা হয়ে ওঠেন, তাই আপনার চারপাশের পরিবেশের কারণে এত বেশি গ্ল্যামার এবং প্রলোভন থাকে যে, আপনার হারাম কাজ করার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়; এই জায়গায় আমি শায়খ ইব্রাহিমের সাথে একমত। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এটি হারাম হয়ে যাবে, আপনি বলতে পারেন এটি মাকরূহ। কারণ আমি জানি বেশিরভাগ অমুসলিম খেলোয়াড় মদ পান করে, পতিতাবৃত্তিতে জড়ায়, কিন্তু আমি এমন অনেক আন্তর্জাতিক স্তরের খেলোয়াড়কে জানি যারা খুব ভালো মুসলিম এবং তারা মোটেও মদ পান করেন না। আবার এমন অনেক মুসলিমকেও জানি যারা মদের গ্ল্যামারে আকৃষ্ট হয়ে মদ পান করা শুরু করে, তাই আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। আপনি যত ওপরের স্তরে যাবেন, আপনাকে তত বেশি সতর্ক হতে হবে।

এবার এমন একটি প্রশ্নে আসি যা শায়খ ইব্রাহিম উল্লেখ করেননি, অথচ এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় যা ফুটবল খেলা পেশা হিসেবে গ্রহণ করাকে হারামের দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিষয়টি হলো, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে আপনাকে এমন সব কোম্পানির ব্র্যান্ড স্পনসর করে, যাদের ব্র্যান্ডিং করা হারাম। আপনি আপনার টি-শার্টে কোনো মদের কোম্পানির লোগো লাগিয়ে সেটির প্রচার করতে পারেন না, এটি হারাম।

আমি আন্তর্জাতিক স্তরের অনেক মুসলিম খেলোয়াড়কে জানি যারা মদের কোম্পানির লোগো বা ব্র্যান্ড থাকা টি-শার্ট পরতে অস্বীকৃতি জানান, যা খুবই ভালো। কিন্তু একই সময়ে দেখা যায় সেই মুসলিম খেলোয়াড়টিই একটি সুদী ব্যাংকের ব্র্যান্ডের লোগো পরে আছেন। এটি দ্বীনি জ্ঞানের অভাব অথবা হয়তো সেই ব্যাংক থেকে পাওয়া অর্থের পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ার কারণে তিনি ‘না’ বলতে পারেননি। তাই আমি শায়খ ইব্রাহিমের সাথে একমত যে, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে এই হারাম কাজগুলোকে ‘না’ বলা খুবই কঠিন। আপনার নফস বা কুপ্রবৃত্তি সেখানে বাধা দেবে—আপনি যখন কয়েক মিলিয়ন ডলার পেতে যাচ্ছেন শুধু মদের কোনো ব্র্যান্ডের লোগো লাগানো টি-শার্ট পরলে, তখন এই বিপুল পরিমাণ অর্থের লোভ সংবরণ করা খুবই কঠিন।

বিজ্ঞাপন

ইউরো কাপ ২০২০-এর সময়ে যা ঘটেছে আমরা দেখেছি। এটি ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছে, কারণ ২০২০ সালে মহামারী ছিল, জুনের ১৪ তারিখ সোমবার, ম্যাচের আগের একটি সাক্ষাৎকারের সময় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো—যিনি বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড়, ফেসবুকে তার ১৪০ মিলিয়নেরও বেশি এবং ইনস্টাগ্রামে ২৪০ মিলিয়নেরও বেশি ফলোয়ার রয়েছে—তিনি যখন ইন্টারভিউয়ের টেবিলে বসলেন, সেখানে কোকাকোলার দুটি ক্যান রাখা ছিল। তিনি কোকা-কোলার সেই দুটি ক্যান সরিয়ে পাশে রেখে দিলেন এবং একটি পানির বোতল তুলে ধরে পর্তুগিজ ভাষায় বললেন ‘আকুয়া’, যার অর্থ পানি পান করুন।

এর মাত্র দুই দিনের মধ্যে যে রিপোর্টটি আসে তা হলো, কোকাকোলা কোম্পানি ৪ বিলিয়ন ডলারের লোকসানের মুখে পড়েছে। আমি যখন এই খবরটি শুনি, আমি ভেবেছিলাম এটি হয়তো অতিরঞ্জন। আমি ভাবলাম মাত্র এক বা দুই দিনে একটি কোম্পানির কীভাবে চার বিলিয়ন ডলার লোকসান হতে পারে? এটি তো কোকা-কোলার মোট আয় নয়। আমি ভেবেছিলাম এটি বাড়িয়ে বলা হয়েছে। তারপর আমি গুগলে ‘ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ফোর বিলিয়ন ডলার কোকাকোলা’ লিখে সার্চ করলাম এবং বিস্তারিত প্রতিবেদনটি এলো। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যখন কোকের দুটি ক্যান সরিয়ে পাশে রাখলেন, তখন কোম্পানির শেয়ারের দাম কমে যায়। কোকাকোলা কোম্পানির শেয়ারের দাম ৫৬.১ থেকে কমে ৫৫.২২-এ নেমে আসে। কোকাকোলা কোম্পানির মোট মূল্য ছিল ২৪২ বিলিয়ন ডলার, যা মাত্র এক বা দুই দিনের মধ্যে কমে ২৩৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। অর্থাৎ শেয়ার প্রতি মূল্য ৮৮ সেন্ট কমে যাওয়ার কারণে এবং মোট শেয়ারের সংখ্যা দিয়ে তা গুণ করার পর দেখা যায় ৪ বিলিয়ন ডলারের লোকসান হয়েছে, যা আমি নিশ্চিত হয়েছি।

একই ইউরো কাপ ২০২০-এ আমাদের একজন খুব বিখ্যাত মুসলিম খেলোয়াড় পল পগবাও ছিলেন। তার ইন্টারভিউয়ের সময় যখন সামনে একটি বিয়ার বা অ্যালকোহলের বোতল রাখা হলো, তিনি সেটি সরিয়ে পাশে রেখে দিলেন। তিনি একটি কথাও বলেননি, কিন্তু এটি লাখ লাখ মানুষ দেখেছে। এর কয়েকদিন পর ইউরো কাপ কর্তৃপক্ষ জানায় যে, ভবিষ্যতে কোনো মুসলিম খেলোয়াড় যখন ইন্টারভিউ দেবেন, তখন তাঁর সামনে কোনো অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় রাখা হবে না। আলহামদুলিল্লাহ, একটি নতুন নিয়ম পাস হলো।

তাই আমি উচ্চস্তরের ফুটবল খেলার ক্ষেত্রে শায়খ ইব্রাহিমের সাথে অনেকখানি একমত। সাধারণ স্তরের ক্ষেত্রে আমি তাঁর সাথে পুরোপুরি একমত নই। উচ্চস্তরে অনেক ঝুঁকি থাকে এবং আপনি যত উঁচুতে যাবেন, সব হারাম থেকে দূরে থাকা আপনার জন্য তত বেশি কঠিন হবে। উচ্চ স্তরে বা আন্তর্জাতিক স্তরে তিনি যদি এটিকে হারাম বলেন, তবে আমি তীব্র আপত্তি করব না, তবুও আমি বলব এটি মাকরূহ। কারণ একজন দৃঢ় ইমানের মুসলিম বলতে পারেন যে, আমি আমার টি-শার্টে কোনো হারামের বিজ্ঞাপন রাখব না এবং আমি নিয়মিত সঠিক সময়ে আমার নামাজ আদায় করব।

খেলার কারণে মাঝেমধ্যে যদি জামাত ছুটেও যায়, যতক্ষণ না আপনি নিজে থেকে ইচ্ছা করে নামাজ কাজা করছেন, ততক্ষণ তা বড় গুনাহ নয়। যেমন আপনি যখন কোনো পরীক্ষায় বসেন তখন হয়তো মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার সময় পান না, তখন আপনি হয়তো নিজে একা বা বন্ধুদের সাথে একটু দেরিতে নামাজ পড়ে নেন। তাই খুব ব্যতিক্রমী কোনো কারণে যদি মসজিদের জামাত ছুটে যায় এবং আপনি আপনার বন্ধুদের সাথে জামাত করে নামাজ পড়ে নেন, তবে তা কোনো বড় বিষয় নয়।

তবে আগে যেমন বলেছি, উচ্চস্তরে আপনাকে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলার সময় ‘না’ বলা কঠিন, কারণ আপনাকে লাখ লাখ ডলার দেওয়া হচ্ছে, প্রতিবার ‘না’ বললে আপনি লাখ লাখ ডলার হারাবেন। আপনার নফস আপনাকে তা সহজে করতে দেবে না, এটি একটি বড় প্রলোভন। তাই আমি বলব আন্তর্জাতিক স্তরে পেশা হিসেবে ফুটবল নেওয়া মাকরূহ, কারণ প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে যে, এটি আপনাকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।

কিন্তু আপনার শহরে বা আপনার এলাকায় ছোটখাটো কোম্পানির হয়ে পেশাদার ফুটবল খেলা এবং তার জন্য পারিশ্রমিক পাওয়াকে আমি হারাম মনে করি না। হ্যাঁ, তবুও আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে, এটি মাকরূহের ক্যাটাগরিতে আসতে পারে, কিন্তু একজন মুসলিম যদি সতর্ক থাকেন তবে যতক্ষণ পর্যন্ত এটি শরিয়তের কোনো নিয়ম ভঙ্গ না করছে, ততক্ষণ এটি অনুমোদিত।