রংপুর নগরীর একটি হোটেলের ছাদ থেকে পড়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থী নুজসাতের (১৮) মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় রংপুর মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, ভবনের ছাদ থেকে লাফ দেওয়ার আগে নুজসাত তার মোবাইল ফোনটি ‘ফ্যাক্টরি রিসেট’ করেছিলেন। তবে ফোনের সিমের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীর সঙ্গে সর্বশেষ ফোনালাপের তথ্য পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) দুপুরে নগরীর ধাপ এলাকা থেকে শাহরিয়ার আহমেদ সাকিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ। পরে নুজসাতের বাবার দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
গ্রেপ্তার শাহরিয়ার আহমেদ সাকিন রংপুর মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। তিনি নগরীর ধাপ চিকলীভাটা এলাকার বাসিন্দা। তিনি এক সময় নুজসাতকে প্রাইভেট পড়াতেন। তদন্তে দুজনের মধ্যে প্রায় ৯ থেকে ১০ মাসের প্রেমের সম্পর্কের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সোমবার (২২ জুন) বিকেলে নগরীর পায়রা চত্বর এলাকার নর্থ ভিউ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ছাদ থেকে পড়ে নুজসাতের মৃত্যু হয়। তিনি নগরীর খলিফাপাড়া এলাকার নজরুল ইসলামের মেয়ে এবং ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার নগরীর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন নুজসাতের বাবা নজরুল ইসলাম। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, ঘটনাস্থলে মেয়ের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি পান, যেখানে মেসেজসহ বিভিন্ন তথ্য ডিলিট করা অবস্থায় ছিল। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, মেয়ের প্রাইভেট শিক্ষক শাহরিয়ার আহমেদ সাকিনের সঙ্গে তার মেয়ের একসঙ্গে তোলা ছবি এবং কথোপকথনের মেসেজ মোবাইল ফোনে ছিল।
এজাহারে তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাকিনের মানসিক নির্যাতনের কারণে তার মেয়ের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি সন্দেহ করছেন। মামলায় আরও ৪-৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলে মহানগর ডিবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, তার বিরুদ্ধে আমলযোগ্য অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছি। এ ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে আমরা তাকে প্রথমে হেফাজতে নিই। পরে নিহতের বাবার দায়ের করা মামলায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ঘটনার সময় অভিযুক্ত শিক্ষার্থী হোটেলের আশপাশে কোথাও ছিলেন না, এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তও বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
সনাতন চক্রবর্তী বলেন, তাদের কথোপকথনের কল রেকর্ড সংগ্রহ করে যাচাই করা হয়েছে। নিহতের বন্ধুদের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে। তদন্তে প্রায় ৯ থেকে ১০ মাসের সম্পর্কের তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সময়ে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ ও যোগাযোগেরও প্রমাণ মিলেছে।
তিনি আরও বলেন, লাফ দেওয়ার আগে নুজসাত তার মোবাইল ফোন ‘ফ্যাক্টরি রিসেট’ করেছিলেন। ফলে ফোনে কোনো ডাটা পাওয়া যায়নি। তবে সিমের কল ডিটেইলস বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে মৃত্যুর পেছনের মূল কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
এদিকে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে সোমবার বিকেল ৪টা ৫৪ মিনিটে নুজসাতকে হোটেলের ছাদে উঠতে দেখা যায়। সেখানে কিছু সময় অবস্থান করে তিনি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। পরে বিকেল ৫টা ৪২ মিনিটের দিকে মোবাইল ফোন রেখে ছাদের রেলিংয়ের ওপর বসার একপর্যায়ে নিচে পড়ে যেতে দেখা যায়।
তবে থানা থেকে আদালতে নেওয়ার পথে সাংবাদিকদের কাছে সাকিন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘নুজসাত আমার ছাত্রী ছিল। চারজনের একটি ব্যাচে সে আমার কাছে পড়ত। একপর্যায়ে আমি বুঝতে পারি সে আমাকে পছন্দ করে। তখন আমি ওই ব্যাচ থেকে সরে আসি। পরে তার মায়ের অনুরোধে তাকে অন্য একটি ব্যাচে নিই। কিন্তু সেখানেও সে আমাকে পছন্দ করত এবং বিভিন্ন ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করত। পরে আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিই।’
সাকিন দাবি করেন, প্রায় তিন মাস আগে তিনি নুজসাতকে পড়ানো বন্ধ করেন। তার মৃত্যুর ঘটনায় নিজের কোনো। দায় নেই বলেও দাবি করেন তিনি।