একসময় বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলায় পাঠকের ভিড় মানে ছিল প্রিয় লেখকের নতুন বইয়ের জন্য অপেক্ষা। সেই ভিড়ে আলাদা করে চোখে পড়ত দুটি নাম—হুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলন। স্টলের সামনে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে পাঠকেরা কিনতেন তাদের বই। পরে এ তালিকায় যুক্ত হয় মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও আনিসুল হকের মতো জনপ্রিয় লেখকের নাম। তবে নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় ধরে কথাসাহিত্যের পাঠকসমাজে ইমদাদুল হক মিলনের অবস্থান ছিল স্বতন্ত্র।
সাহিত্য থেকে সাংবাদিকতা—দুই অঙ্গনেই পরিচিত এই লেখক সাম্প্রতিক সময়ে আবার আলোচনায় এসেছেন ভিন্ন এক কারণে। দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদকীয় নেতৃত্বে আকস্মিক পরিবর্তনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার নাম। অনেকের প্রশ্ন—কালের কণ্ঠের সাবেক সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন এখন কোথায়? কেনই বা তার নাম আবার আলোচনার কেন্দ্রে?
কালের কণ্ঠে সম্পাদক পরিবর্তনের ঘটনাকে ঘিরেই মূলত এ আলোচনা। পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক পদ থেকে কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজের সরে যাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক ব্যক্তির হাতে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব যাওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যম অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এ পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেই ফিরে এসেছে ইমদাদুল হক মিলনের নাম—যিনি দীর্ঘদিন কালের কণ্ঠের সম্পাদকীয় নেতৃত্বে ছিলেন।
২০১০ সালে প্রকাশের পর কালের কণ্ঠ দ্রুত দেশের অন্যতম আলোচিত জাতীয় দৈনিকে পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠার পর একপর্যায়ে পত্রিকাটির সম্পাদকীয় নেতৃত্বে ছিলেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। সাহিত্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি সংবাদপত্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও তিনি দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তার সময়ে কালের কণ্ঠ সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিনোদন ও সমসাময়িক নানা বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।
২০২৪ সালের আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কালের কণ্ঠের সম্পাদকীয় নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসে। এরপর ইমদাদুল হক মিলন দায়িত্ব ছাড়েন। পরে পত্রিকাটির সম্পাদকীয় দায়িত্বে আসেন কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজ। হাসান হাফিজের বিদায়ের পর আবার আলোচনায় এসেছে আগের সম্পাদক মিলনের নাম।
ইমদাদুল হক মিলনের বর্তমান অবস্থান নিয়েও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর তাকে দেশের সাহিত্য অনুষ্ঠান, টেলিভিশনের আলোচনাসভা কিংবা নিয়মিত গণমাধ্যম উপস্থিতিতে আগের মতো দেখা যায়নি। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ওই সময়ের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। তবে তিনি পুরোপুরি আড়ালে চলে যাননি।
গত ২২ মে থেকে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হওয়া চার দিনের ৩৫তম নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার উদ্বোধন করেন ইমদাদুল হক মিলন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। উদ্বোধনী দিনে আরও উপস্থিত ছিলেন রওনক জাহান, ফরিদুর রেজা সাগর, সুবোধ সরকার, দীপেন ভট্টাচার্য, তৌফিক ইমরোজ খালিদী, ফারুক মঈনউদ্দীন, সাদাত হোসাইন, বব হোলম্যানসহ দেশ-বিদেশের বহু লেখক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
অর্থাৎ দেশের প্রকাশ্য সাহিত্য পরিসরে তার উপস্থিতি কমলেও লেখক হিসেবে তার যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইমদাদুল হক মিলনের উপস্থিতি আগের তুলনায় কম। এ কারণেই কালের কণ্ঠের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তার নাম যুক্ত হয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ফেসবুকে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মতামত জানাচ্ছেন। রাকিব হাসান নামে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “একজন সম্পাদক পরিবর্তন হলে তার পেছনের কারণ নিয়ে আলোচনা হবেই। তবে একজন লেখকের অবদানকে শুধু একটি পদ দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না।” সাবিনা ইয়াসমিন নামে আরেকজন লিখেছেন, “ইমদাদুল হক মিলন বাংলা সাহিত্যের পরিচিত নাম। তিনি এখন কোথায় আছেন, সেটির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার সাহিত্যিক অবদান।”
তবে অন্যদিকে কেউ কেউ কালের কণ্ঠের সম্পাদকীয় পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। মাহমুদুল করিম নামে এক পাঠক মন্তব্য করেছেন, “একটি জাতীয় দৈনিকের নেতৃত্বে বারবার পরিবর্তন হলে পাঠকের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠানটির উচিত বিষয়গুলো পরিষ্কার করা।”
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, সংবাদপত্রের সম্পাদক শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন না; তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি, সম্পাদকীয় অবস্থান ও পাঠকের আস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে সম্পাদক পরিবর্তনের ঘটনা সাধারণ কোনো সাংগঠনিক পরিবর্তনের চেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয়।
ইমদাদুল হক মিলনের নামও তাই শুধু একজন সাবেক সম্পাদক হিসেবে নয়, একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হিসেবেও আলোচনায় এসেছে। তার সাহিত্যিক জনপ্রিয়তা, কালের কণ্ঠে তার সময় এবং বর্তমান সম্পাদকীয় পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন গণমাধ্যম ও সাহিত্য অঙ্গনের আলোচনার অংশ।
তবে শেষ পর্যন্ত কালের কণ্ঠের নেতৃত্ব পরিবর্তনের পেছনে প্রকৃত কারণ কী, ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গে ভবিষ্যতে সংবাদপত্রের কোনো সম্পর্ক তৈরি হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। আপাতত নিশ্চিতভাবে বলা যায়, দেশের সাহিত্য ও সাংবাদিকতার দুই অঙ্গনের পরিচিত এই নামটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
ইমদাদুল হক মিলনের সাহিত্যিক যাত্রা শুরু হয়েছিল গল্প ও উপন্যাস দিয়ে। দেশের মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, প্রেম, সম্পর্ক, সমাজবাস্তবতা ও মানুষের আবেগ তার লেখার বড় বিষয়। ‘নূরজাহান’ উপন্যাস তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এর বাইরে তার অসংখ্য গল্প, উপন্যাস ও শিশু-কিশোর সাহিত্য পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
সাহিত্যাঙ্গনে তার জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, একসময় বইমেলায় তার নতুন বই প্রকাশ মানে ছিল পাঠকের বিশেষ আগ্রহ। প্রকাশকের স্টলে তার বই ঘিরে পাঠকের ভিড় ছিল পরিচিত দৃশ্য। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি যেমন বিপুল পাঠক তৈরি করেছেন, তেমনি সংবাদপত্রের সম্পাদক হিসেবেও নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছেন।
এদিকে হাসান হাফিজের কালের কণ্ঠের সম্পাদকের পদ ছাড়ার কারণ নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে বলা হচ্ছে, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, সম্পাদকীয় নীতি, পেশাগত সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা, মালিকপক্ষের কৌশলগত ভাবনা এবং সাংবাদিক রাজনীতির বিভিন্ন সমীকরণ—সব মিলিয়েই এ পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা থাকতে পারে। তবে এসব আলোচনার অনেক কিছুই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়।
২০২৪ সালের আগস্টের শেষ দিকে হাসান হাফিজ কালের কণ্ঠের সম্পাদকীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘদিনের সাংবাদিক, কবি এবং সংবাদপত্র অঙ্গনের পরিচিত মুখ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজ করার পাশাপাশি তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের নেতৃত্বেও ছিলেন। তার নিয়োগের সময় দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটও আলোচনায় আসে।
কালের কণ্ঠের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ভাষ্য, সম্পাদক পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ নিয়ে আলোচনা থাকলেও সবকিছুকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কেউ কেউ মনে করছেন এটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক পরিবর্তন, আবার কেউ বলছেন সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ কৌশল ও সম্পাদকীয় কাঠামো পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবেও বিষয়টিকে দেখা যেতে পারে।