Image description

বিশ্বের বিস্তীর্ণ ভূমি আজ নানা ধরনের পরিবেশগত অবক্ষয়ের শিকার, যার একটি অংশ মরুকরণের ঝুঁকিতে রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, খরা, ভূমি অবক্ষয় ও মরুকরণের ফলে প্রতিবছর বিশ্বের বিপুল পরিমাণ উর্বর জমি উৎপাদনক্ষমতা হারাচ্ছে।

খরার সমস্যাকে একসময় আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের জন্য বিপদ হিসেবে দেখা হতো। তা এখন বাংলাদেশের জন্যও নতুন ঝুঁকির বার্তা দিচ্ছে। প্রতি বছর বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এই দূর্যোগের পাশাপাশি অতি উচ্চ তাপমাত্রা ও খরা বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলকে উষ্ণ ও খরাপ্রবণ মনে করা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের প্রায় সব এলাকাতেই তীব্র গরম বা তাপপ্রবাহের সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

জাতিসংঘের মতে, শুষ্ক বা প্রায় শুষ্ক কিংবা নিম্ন আর্দ্রতাযুক্ত অঞ্চলে ভূমির আর্দ্রতা কমে যাওয়াকে ‘মরুকরণ’ বলা হয়। এটি সাধারণত প্রাকৃতিক বা মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণেই ঘটে। আর খরা হলো কোনো সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে বহু বছরের গড় বৃষ্টিপাতের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টি হওয়া।

১৯২১ সালে প্রথম অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া অঞ্চল থেকে সিলেটের চা–বাগানে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ইউক্যালিপটাস নিয়ে আসা হয়। এরপর ১৯৬০ সালের দিকে কিছু চারা আসে। তবে বড় পরিসরে এই গাছ দেশে আনা হয় ১৯৭৭-১৯৭৮ সালের দিকে।

বাংলাদেশে সাধারণত চার মাস বর্ষার যে পানি নদী, খাল-বিল ও বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে মজুত থাকে, তা শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব দূর করে। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জলাভূমি ভরাট করার ফলে প্রাকৃতিক জলাধারগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই গত কয়েক দশক ধরে দেশের নদীগুলো অনেক স্থানে নাব্যতা হারিয়ে শুকিয়ে গেছে।

গত বছরের ২৪ আগস্ট জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদ বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁসহ পাঁচটি জেলার ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের ৪ হাজার ৯১১টি মৌজা এবং সাড়ে পাঁচ হাজার গ্রামকে বর্তমানে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পানিসংকট এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে আরও ৪৭টি ইউনিয়নের এক হাজার ৫০৩টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২০০০ সালের পর থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে গেছে। ফলে এই অঞ্চল পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন। প্রভাব পড়েছে প্রায় কয়েক কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর। সঙ্গে যোগ হয়েছে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব। শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি বাংলাদেশের নদ-নদীতে প্রবাহিত হতে পারছে না। ফলে গঙ্গা অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচ কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। নদীগুলো শুকিয়ে চৌচির হয়ে যাওয়ায় কৃষিপণ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)-এর তথ্যমতে, গত ৪০ বছরে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—এই তিন প্রধান নদীতে প্রায় দেড় লাখ হেক্টর জমি নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। অথচ এর বিপরীতে নতুন চর বা জমি জেগেছে মাত্র ৩০ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ, নদী ভাঙনের ফলে দেশ যে পরিমাণ জমি হারিয়েছে, নতুন জমি জেগেছে তার অনেক কম।

গত বছরের ২৪ আগস্ট জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদ বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁসহ পাঁচটি জেলার ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের ৪ হাজার ৯১১টি মৌজা এবং সাড়ে পাঁচ হাজার গ্রামকে বর্তমানে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পানিসংকট এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

জাতিসংঘের আইপিসিসির হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের তাপমাত্রা ২০৩০ সালের মধ্যে শিল্পবিপ্লবের শুরুর সময়ের তুলনায় ০ দশমিক ৪৪ থেকে ০ দশমিক ৬৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ২০৫০ সালের মধ্যে তা ১ দশমিক ৩ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের এই সংকট ও মরুকরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ আছে কিছু গাছের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি (একাশিয়া) গাছ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এসব গাছের অতিরিক্ত পানি শোষণক্ষমতা মাটিকে রুক্ষ ও শুষ্ক করে তোলে। এই কারণে গত বছরের মে মাসে দেশের সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণিগাছের চারা তৈরি, রোপণ এবং বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছে সরকার।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের এক গবেষণা অনুযায়ী, এক ঘন সেন্টিমিটার কাঠ উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি পানি শোষণ করে কদমগাছ, যার পরিমাণ ৪ হাজার ২৩৩ মিলিলিটার। তবে বিদেশি জাতের মধ্যে ইউক্যালিপটাসের ‘ক্যামালডালেন্সিস’ প্রজাতিটি প্রতি ঘন সেন্টিমিটার কাঠ উৎপাদনে মাটির নিচ থেকে শুষে নেয় ৩ হাজার ১৪৫ মিলিলিটার পানি। অন্যদিকে, সমপরিমাণ কাঠ তৈরিতে একাশিয়া বা আকাশমণি শুষে নেয় ২ হাজার ২২৩ মিলিলিটার পানি। এর বিপরীতে আমাদের দেশীয় মেহগনি গাছের পানি লাগে মাত্র ১ হাজার ৬১৫ মিলিলিটার।

১৯২১ সালে প্রথম অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া অঞ্চল থেকে সিলেটের চা–বাগানে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ইউক্যালিপটাস নিয়ে আসা হয়। এরপর ১৯৬০ সালের দিকে কিছু চারা আসে। তবে বড় পরিসরে এই গাছ দেশে আনা হয় ১৯৭৭-১৯৭৮ সালের দিকে। ঠিক একই সময়ে আকাশমণি গাছও দেশে প্রবেশ করে। সেসময় বাংলাদেশ ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিএফআরই) পরীক্ষামূলকভাবে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, হাটহাজারী, মধুপুর এবং দিনাজপুরের বিভিন্ন বনাঞ্চলে এটির উপযোগিতা পরীক্ষা করে। এরপরই মূলত সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে পুরো দেশে গাছটির বিস্তার ঘটে।

ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির প্রধান সমস্যা হলো এগুলোর অতি দ্রুত বৃদ্ধি। দ্রুত বড় হওয়ার জন্য এরা মাটির গভীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি শোষণ করে। এ ছাড়া গাছগুলো যেখানে লাগানো হয়, সেখানে চারদিকে অজস্র বীজ ছড়ায়। এর কারণে ইউক্যালিপটাস বনের নিচে বা আশেপাশে অন্য কোনো দেশীয় প্রজাতির গাছ জন্ম নেওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে মাটির প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।

ইউক্যালিপটাস নিয়ে আরও অভিযোগ আছে যে, এটি মাটির স্বাভাবিক পুষ্টিগুণ এবং আর্দ্রতা নষ্ট করতে পারে। এই গাছের পাতা সহজে পচে না বলে মাটির উপরিভাগের অম্লত্ব বাড়িয়ে দেয় এবং চারপাশে থাকা ফসলি জমির ক্ষতি করে। তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই গবেষণা প্রতিবেদনে একটি বিকল্প সমাধানের কথাও বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এককভাবে শুধু ইউক্যালিপটাসের বাগান না করে যদি অন্যান্য মিশ্র দেশীয় প্রজাতির গাছের সঙ্গে এটি রোপণ করা হয়, তবে মাটির গুণাগুণ কিছুটা ঠিক থাকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ রকম মিশ্র প্রজাতির বাগানের মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ওই মিশ্র বাগানের মাটিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামসহ প্রয়োজনীয় সব উপাদানের ভারসাম্য একদম ঠিক থাকে।