Image description

কিশোরগঞ্জের নিকলী ও সুনামগঞ্জের শাল্লায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানির পর প্রণোদনা ও সরকারি সহায়তার তালিকায় প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও তাদের স্বজনদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে তালিকা তৈরি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এতে বাদ পড়েছেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত বর্গাচাষি ও প্রান্তিক কৃষকদের নাম। অথচ জনপ্রতিনিধি ও তাদের আত্মীয়স্বজনদের নাম ঢুকেছে তালিকায়।

নিকলী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, কৃষকদের কাছ থেকে ক্ষতির পরিমাণ চেয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে উপজেলা কৃষি অফিস। জানা গেছে, নিকলী উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে তিন হাজার ১৮০ জনের নামের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় দুই হাজার ১৮০ জনের নাম অনুমোদন করে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ এনে সিংপুর ইউনিয়নের কৃষক রুকন আহমেদ (৩০) বলেন, ‘চাষাবাদ করে সাত লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। কিন্তু তার নাম ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় নাই, অথচ চাষাবাদ করেনি এমন অনেকের নাম রয়েছে তালিকায়’। জারইতলা ইউনিয়নের সাজনপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের ইসমাইল (৬০) বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতে অনিয়ম হয়েছে, চাষাবাদ করেননি এমন লোক প্রণোদনা পাচ্ছে আর প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন।

গতকাল সোমবার ভাটিবরাটিয়া গ্রামের খাইরুজ্জামান সিংপুর ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাজীব আহম্মেদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিষয় তুলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাজীব আহম্মেদ বলেন, যাচাই-বাছাইয়ের সময় উপস্থিত জনপ্রতিনিধি ও গ্রামপুলিশ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম চিহ্নিত করেছেন। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা। ছাতিরচর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার জলিল মিয়া (৬৫) জানান, অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে সরকারি চাকরিজীবী ও কৃষক নয় এবং চাষাবাদের সঙ্গে জড়িত নেই এমন একাধিক নাম রয়েছে বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে নিকলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেহানা মজুমদার মুক্তি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় কোনো প্রকার অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির সুযোগ নেই। অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি জানান।

শাল্লা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার চারটি ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত বিশেষ প্রণোদনা মানবিক সহায়তা ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার চারটি ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা ও উজানের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রথম ধাপে ২০ হাজার ২৫০ জন কৃষকের নামের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। চূড়ান্ত তালিকায় ১০ হাজার ১৫০ জন কৃষকের নাম স্থান পায়। চূড়ান্ত তালিকায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির যেন শেষ নেই। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে তালিকায় স্থান পেয়েছেন ব্যবসায়ী, অকৃষক, উদ্যোক্তা, চাকরিজীবীসহ তাদের পরিবারের সদস্যরা। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় বসবাস করেন। উপজেলার ভরাম হাওরের কৃষক আগুয়াই গ্রামের বাসিন্দা জয়ন্ত চন্দ্র দাস বলেন, ‘তেরো কের (২৮ শতকে ১ কের) জমি করেছিলাম। কোনোমতে তিন কের জমিনের ধান কাটলেও রোদের অভাবে সে ধানগুলোও পচে যায়। মেম্বার প্রথমে আমার নাম তালিকায় দিছিল। ভাবছিলাম সরকারের সহায়তা পেলে কিছুটা হলেও পরিবারে স্বস্তি মিলবে। কিন্তু হঠাৎ শুনি আমার নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। এখন মেম্বারকে ফোন দিলেও ফোন ধরে না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার এক নম্বর আটগাঁও ইউনিয়নে প্রকৃত কৃষকদের নাম বাদ দিয়ে স্বজনপ্রীতি করে মহিলা ইউপি সদস্য নুরজাহান আক্তারের স্বামী ফজলু মিয়া, শশুর জলিল মিয়া ও দেবর বাচ্চু মিয়ার নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই ইউনিয়নের মহিলা সদস্য সুজিয়া বেগমের দুই ছেলে হাকিমুল মিয়া ও আলি আহমদের নাম রয়েছে এ তালিকায়।

একই চিত্র দুই নম্বর হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদেও। শুধু তাই নয়, কৃষক নন এমন ভুয়া ব্যক্তির নাম থাকার তথ্যও মিলেছে এ ইউনিয়নে। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে তাদের বিল দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন দুই নম্বর হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুবল চন্দ্র দাস। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, বাহাড়া ইউনিয়নের বিষয়গুলো ইতোমধ্যে সমাধান করার জন্য সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অনিয়মের তথ্যসহকারে কেউ অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।