Image description

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মাত্র চার কার্যদিবসে বিচার শেষ করে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। কিন্তু এর উল্টো চিত্রও রয়েছে। দেশে অনেক ধর্ষণ ও হত্যা মামলা মাসের পর মাস, বছরের পর বছর তদন্ত পর্যায়েই আটকে আছে। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও বেশির ভাগ ঘটনায় তা মানা হয় না।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যেসব ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে কিংবা মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হয়, সেসব ক্ষেত্রে তদন্ত তুলনামূলক দ্রুত এগোয়। কিন্তু আলোচনার বাইরে থাকা অধিকাংশ মামলার তদন্তে গতি পায় না।

তবে পুলিশ বলছে, ডিএনএ পরীক্ষা, মেডিক্যাল প্রতিবেদন এবং ফরেনসিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক মামলার তদন্ত নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয় না।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে ৫ হাজার ৪৪৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরের থানাগুলোতে হয়েছে ৪১৩ মামলা।
 

গত বছরের ৫ মে বান্দরবানের থানচির তিন্দু ইউনিয়নের মংখ্যং পাড়ায় জুমখেতে ধান রোপণ করতে যান চিংমা খিয়াং নামের এক নারী। সন্ধ্যায় বাড়ি না ফেরায় পরিবারের লোকজন খুঁজতে গিয়ে তাঁর মরদেহ পান। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, রাস্তার কাজে নিয়োজিত তিন শ্রমিক তাঁকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। পরদিন ওই নারীর স্বামী সুমন খিয়াং বাদী হয়ে থানচি থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে মামলা করেন। এ ঘটনার বিচার চেয়ে এলাকার লোকজন মানববন্ধন করেন। বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও দ্রুত বিচার চেয়ে বিবৃতি দেন ৪৭৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক।

এই মামলা সম্পর্কে খোঁজ নিতে গত শনিবার প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকারের সঙ্গে। তিনি কিছুদিন আগে এখানে যোগ দিয়েছেন জানিয়ে বলেন, এ মামলার আসামিদের এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। মামলার অগ্রগতিও সেভাবে হয়নি।

তদন্তের সময়সীমা পুলিশ মানার চেষ্টা করে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা না গেলে আদালতে আবেদন করে সময় বাড়িয়ে নেওয়া হয়। অনেক মামলায় ডিএনএ টেস্ট ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বেশি সময় লেগে যায়। তবে তদন্ত শেষ হলে যত দ্রুত সম্ভব আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।
এস এন মো. নজরুল ইসলাম, অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস), ডিএমপি

৩ মাসে সাড়ে ৫ হাজার মামলা

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে ৫ হাজার ৪৪৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরের থানাগুলোতে হয়েছে ৪১৩ মামলা।

ঢাকার আদালত সূত্র জানায়, ৪১৩টি মামলার মধ্যে ৩ মাসে ৬৫টির অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। আর ঘটনার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা না পেয়ে ১০টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোর তদন্ত শেষ হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত তিন মাসে ডিএমপির ৫০টি থানার অধীনে শুধু ধর্ষণের অভিযোগে ১৭৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নারী ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলার সংখ্যা ১১৫ এবং শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলার সংখ্যা ৬৩।

ধর্ষণ মামলা তদন্তের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, অধিকাংশ মামলার তদন্ত শেষ করতে না পারার অন্যতম কারণ মেডিক্যাল প্রতিবেদন না পাওয়া। এই প্রতিবেদন পেতে অনেক সময় এক বছরও পেরিয়ে যায়।

গত ২২ মে রাতে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি আট বছর বয়সী শিশুকে চকলেট খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে রাজধানীর কলাবাগানের নর্থ সাউথ রোডের বাসায় ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন। পুলিশ ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফজলে আশিক শনিবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।

ধর্ষণ মামলার তদন্ত শেষ করতে কেন দেরি হয় জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তের সময়সীমা পুলিশ মানার চেষ্টা করে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা না গেলে আদালতে আবেদন করে সময় বাড়িয়ে নেওয়া হয়। অনেক মামলায় ডিএনএ টেস্ট ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বেশি সময় লেগে যায়। তবে তদন্ত শেষ হলে যত দ্রুত সম্ভব আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।

ধর্ষণ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তাগাদা দিয়ে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হবে। সময়মতো প্রতিবেদন পাওয়া না গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিবেদন সংগ্রহ করে মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করতে হবে।
অধ্যাপক মোস্তাক রহিম স্বপন, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ

গত ২২ এপ্রিল কুমিল্লার মুরাদনগরে স্কুল থেকে ফেরার পথে অপহৃত হয় ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রী। দুই ব্যক্তি মুখ চেপে ধরে ওই ছাত্রীকে হোমনা উপজেলার কুটুমবাড়ি-সংলগ্ন একটি নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করে। বিকেলে গুরুতর অসুস্থ ও রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে স্কুলের সামনে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় তারা। এ ঘটনায় মেয়েটির মা মুরাদনগর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনেরা। মামলায় সাইফুল ইসলামসহ দুজনের জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে যোগাযোগ করা হলে মুরাদনগর থানার ওসি মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আসামিরা পালিয়ে গেছে। মেয়েটির ডাক্তারি পরীক্ষা করানো হলেও প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২৬)-এ তদন্তের সময়সীমা ১৫ কার্যদিবস বেঁধে দেওয়া আছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে।
 

ধর্ষণ মামলা তদন্তের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, অধিকাংশ মামলার তদন্ত শেষ করতে না পারার অন্যতম কারণ মেডিক্যাল প্রতিবেদন না পাওয়া। এই প্রতিবেদন পেতে অনেক সময় এক বছরও পেরিয়ে যায়। ধর্ষণ মামলায় মেডিক্যাল প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ। ভুক্তভোগীর শরীরে যৌন নির্যাতনের আলামত, আঘাতের চিহ্ন, ডিএনএ নমুনা এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য যাচাইয়ের জন্য এ প্রতিবেদন প্রয়োজন।

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানায় গত বছরের ৮ এপ্রিল এক কিশোরীকে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন তার বাবা। এজাহারে বলা হয়, সাততলা বাড়ির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে এক যুবক তাঁর মেয়েকে কৌশলে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও পিরোজপুরে নিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করে। ছয় দিন পর পুলিশ কিশোরীকে উদ্ধারের পর প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে। পরে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতের অনুমতি নিয়ে ডিএনএ নমুনার সঙ্গে গ্রেপ্তার আসামির ডিএনএ তুলনামূলক পরীক্ষা করান। কিন্তু মেডিক্যাল প্রতিবেদন ও ডিএনএ প্রতিবেদন না পাওয়ায় তদন্তও শেষ হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সংগঠন দ্য মেডিকোলিগ্যাল সোসাইটির সহসভাপতি অধ্যাপক মোস্তাক রহিম স্বপন প্রথম আলোকে বলেন, ধর্ষণ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তাগাদা দিয়ে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হবে। সময়মতো প্রতিবেদন পাওয়া না গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিবেদন সংগ্রহ করে মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করতে হবে।

আসামি ধরা পড়লে ১৫ দিনের মধ্যে ধর্ষণ মামলার তদন্তকাজ শেষ করতে হবে। আর আসামি আইনের আওতায় আনা না গেলে ধর্ষণের মামলার তদন্ত ৩০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে।
ফউজুল আজিম, অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ

আইন কী বলে

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২৬)-এ তদন্তের সময়সীমা ১৫ কার্যদিবস বেঁধে দেওয়া আছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে।

মাগুরার শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ধর্ষণের ধারায় উল্লেখযোগ্য কিছু সংশোধন আনে।

আইনে ভুক্তভোগী ও আসামির ডিএনএ পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে বলা হয়েছে, আদালত যদি মনে করেন ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া মেডিক্যাল সনদ দিয়ে বিচারকাজ পরিচালনা করা যাবে, তাহলে ডিএনএ পরীক্ষা লাগবে না। ধর্ষণের (৯ খ বাদে) ঘটনার তদন্ত ও বিচারের সময় অর্ধেক করা হয়েছে। তদন্ত হবে ১৫ দিনে ও বিচার হবে ৯০ দিনে। তবে বিচারক মনে করলে সময় বাড়াতে পারবেন।

দ্রুত তদন্তে করণীয়

ধর্ষণ ও হত্যা মামলা নিয়ে আইন বিশ্লেষণ ও গবেষণা করছেন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম। দ্রুত তদন্ত বিষয়ে করণীয় জানতে চাইলে গতকাল মঙ্গলবার রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আসামি ধরা পড়লে ১৫ দিনের মধ্যে ধর্ষণ মামলার তদন্তকাজ শেষ করতে হবে। আর আসামি আইনের আওতায় আনা না গেলে ধর্ষণের মামলার তদন্ত ৩০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে।

ফউজুল আজিম মনে করেন, ধর্ষণ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্যগত পরীক্ষার জন্য নারী চিকিৎসকের বিশেষ প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তাকে শুধু ধর্ষণের মামলা তদন্ত ছাড়া অন্য কোনো কাজ করানো যাবে না। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তদন্তের জন্য পর্যাপ্ত খরচ দিতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা ও ফরেনসিক প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বাড়ানো জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের ভুক্তভোগীর স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা, ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রতিবেদন দ্রুত তৈরি করতে হবে উল্লেখ করে সাবেক এই জেলা জজ বলেন, তদন্ত কর্মকর্তাকে তৎপর থেকে প্রতিবেদনগুলো সংগ্রহ করতে হবে। সব প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে নির্ধারিত সময়ে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব।