কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না—সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি ছিল অন্যতম আলোচিত প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই স্পষ্ট করেছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ উদ্যোগ। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করা আচরণবিধির খসড়ায় এমন কোনো বিধান রাখা হয়নি, যা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ বন্ধ করবে। ফলে আইনি যোগ্যতা থাকলে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বা দলটির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরাও নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে নামতে পারবেন।
গতকাল বুধবার (১০ জুন) ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আচরণবিধির খসড়া অনুমোদন করে নির্বাচন কমিশন। পরে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের জন্য তা পাঠানো হয়েছে। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে মতামত চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, খসড়াটি চূড়ান্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হতে যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের ভেতরে শুরুতে ভিন্ন ধরনের চিন্তা ছিল। কমিশনের কর্মকর্তারা এমন একটি অঙ্গীকারনামার প্রস্তাব করেছিলেন, যেখানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঘোষণা দিতে হতো যে তারা নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন। সেই প্রস্তাব কার্যকর হলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকের নির্বাচনে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। কিন্তু একাধিক বৈঠক ও আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত সেই শর্ত বাদ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেহেতু দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হবে, তাই কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রার্থী হওয়ার আইনি যোগ্যতা থাকলেই তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করবে না; বরং আইন অনুযায়ী প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা আছে কি না, সেটিই বিবেচ্য হবে।
সরকারের পক্ষ থেকেও একই ধরনের বার্তা এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবে। ফলে আওয়ামী লীগের কেউ যদি নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান, তাহলে তার অংশগ্রহণে বাধা থাকবে না।
এই অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। দলটির নিবন্ধন স্থগিত থাকা এবং কার্যক্রমের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের উপস্থিতি কার্যত অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, সরকারের এই অবস্থানের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রয়োজনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা থাকতে পারে। তাদের মতে, গত কয়েক বছর ধরে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ প্রার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদেশি কূটনীতিকদের প্রকাশ্য বক্তব্যে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অংশগ্রহণের বিষয়টি সরাসরি না থাকলেও ‘ইনক্লুসিভ’ বা অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর তারা বারবার জোর দিয়েছেন। ফলে সরকারও এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না, যা রাজনৈতিক বহিষ্করণের অভিযোগকে আরও জোরালো করবে।
তবে বিশ্লেষকদের আরেকটি অংশ ‘বিদেশিদের চাপ’ শব্দবন্ধের সঙ্গে একমত নন। তাদের মতে, এটি সরাসরি চাপের ফল নয়; বরং আন্তর্জাতিক অংশীদাররা বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে উৎসাহিত করছে। একজন সাবেক নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তার ভাষায়, “পশ্চিমা দেশগুলো আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার জন্য নির্দেশ দিচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু তারা এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা দেখতে চায়, যেখানে বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সমর্থকেরা সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়ে না।”
কিছু বিশ্লেষক আরও এক ধাপ এগিয়ে বলছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ব্যবস্থার সামনে এখন একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার দলটিকে পুরোপুরি রাজনৈতিক বৈধতা ফিরিয়ে দিলেও সরকারের নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে একটি ‘পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
এদিকে আওয়ামী লীগও স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে সক্রিয় হতে শুরু করেছে। দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম জানিয়েছেন, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা নেতা-কর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তার দাবি, আওয়ামী লীগের সমর্থক ও কর্মীদের মধ্য থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রস্তুত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অন্যান্য সমমনা রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগও চলছে।
নির্বাচন কমিশনের খসড়া আচরণবিধিতে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্বাচনী পোস্টার ব্যবহারের সুযোগ থাকছে না। পরিবর্তে ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মাইক ব্যবহার করা যাবে। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও কমিশনের হাতে থাকছে।
নতুন বিধিমালায় অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। একই সঙ্গে ইভিএম ব্যবহারের বিধানও বাদ দেওয়া হয়েছে। ডাকযোগে ভোট বা পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থাও থাকছে না। প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দীর্ঘ সময় নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন চালু করে। পরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সেই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। বর্তমানে আবার নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের আইনি কাঠামো কার্যকর হয়েছে।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ এবার ভিন্ন হতে পারে। তার মতে, জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব খুঁজে পাননি। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ প্রার্থীরা অংশ নিলে সেই ভোট আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
তার ভাষায়, “স্থানীয় নির্বাচন কাগজে-কলমে নির্দলীয় হলেও বাস্তবে প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন থাকে না। ফলে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীরা মাঠে নামলে ভোটের হিসাব নতুনভাবে সাজাতে হবে।”
আগামী আগস্টে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। এরপর ধাপে ধাপে পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এই নির্বাচন শুধু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এটি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান, সরকারের কৌশল এবং আন্তর্জাতিক মহলের প্রত্যাশার মধ্যকার সম্পর্কও নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করবে।
বিদেশিদের চাপ, উৎসাহ নাকি সরকারের নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব—যে কারণই থাকুক না কেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আগামী কয়েক মাসে সেই আলোচনার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যেতে পারে ভোটের মাঠেই