Image description

মুফতি সাইফুল ইসলাম

জাতীয় বাজেট একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি, রাজনৈতিক দর্শন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্র কোন খাতে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে, কার ওপর করের বোঝা চাপছে এবং উন্নয়নের সুফল কারা পাচ্ছে; এসব প্রশ্নের উত্তর বাজেটের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে । আধুনিক বিশ্বে বাজেটকে সাধারণত রাজস্ব, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পের আলোকে মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু ইসলাম বাজেটকে কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ, জবাবদিহিতা এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের একটি নৈতিক কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে।

ইসলামী অর্থনীতির মূল দর্শন হলো, সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তাআলা। মানুষ কেবল সেই সম্পদের আমানতদার। ফলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও কেবল রাজনৈতিক সুবিধা কিংবা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণের জন্য নয়; বরং মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য পরিচালিত হবে। ইসলামী বাজেটব্যবস্থার কয়েকটি মৌলিক নীতিমালা এ ক্ষেত্রেই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামী অর্থনীতির প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো সম্পদের সুষম বণ্টন। ইসলাম সম্পদের কেন্দ্রীকরণকে নিরুৎসাহিত করেছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যাতে সম্পদ শুধু তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সুরা হাশর, আয়াত : ৭)। এই আয়াত ইসলামী অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সম্পদ ধীরে ধীরে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, ফলে ধনী-গরিব বৈষম্য বাড়তে থাকে। ইসলাম এই বৈষম্য দূর করার জন্য যাকাত, সদকা, উশর, উত্তরাধিকার আইন এবং সুদ নিষিদ্ধকরণের মতো ব্যবস্থা চালু করেছে। ইসলামী অর্থনীতিবিদ ড. উমর চাপরা তার ‘ইসলাম এন্ড দ্যা ইকোনমিক চ্যালেঞ্জ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ইসলামের উদ্দেশ্য কেবল সম্পদ সৃষ্টি নয়; বরং সেই সম্পদের ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন নিশ্চিত করা।

দ্বিতীয় মৌলিক নীতি হলো দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা। ইসলামে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি মুমিন নয়, যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ (মুস্তাদরাক হাকিম, হাদিস ; ৭৩০৭)। এ হাদিস ইসলামী কল্যাণরাষ্ট্রের ভিত্তিকে স্পষ্ট করে। মহানবী (সা.)-এর যুগে যাকাতকে কেবল ব্যক্তিগত দান হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার জায়গায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পবিত্র কোরআনে যাকাতের খাত নির্ধারণ করে বলা হয়েছে, “যাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের হৃদয় আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৬০)। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) কিতাবুল খারাজ-এ লিখেছেন, রাষ্ট্রের কোষাগারের প্রথম অধিকার হলো অভাবগ্রস্ত মানুষের।

তৃতীয় নীতি হলো ন্যায়ভিত্তিক করব্যবস্থা। ইসলাম কর আরোপকে জনগণের ওপর জুলুমের মাধ্যম না বানিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন এবং মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেছে। ইসলামী রাষ্ট্রে যাকাত, উশর, খারাজ ও জিজিয়ার মতো করব্যবস্থা ছিল সুস্পষ্ট ও সুনির্ধারিত। কৃষকের ওপর এমন কর আরোপ করা হতো না, যা তার উৎপাদনক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। উমর (রা.)-এর শাসনামলে কৃষিজমির উৎপাদন ও মানুষের সক্ষমতা বিবেচনা করে কর নির্ধারণ করা হতো। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) লিখেছেন, অতিরিক্ত কর অর্থনীতিকে ধ্বংস করে এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। বর্তমান সময়ে যখন মূল্যস্ফীতি ও ভ্যাটনির্ভর রাজস্বনীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে, তখন ইসলামের করনীতির ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

চতুর্থ নীতি হলো সুদমুক্ত অর্থনীতি। ইসলাম সুদকে কেবল একটি অর্থনৈতিক ত্রুটি হিসেবে নয়, বরং সামাজিক জুলুম হিসেবে বিবেচনা করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৫)। আরেক স্থানে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যদি সুদ পরিত্যাগ না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৯)। আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রগুলোকে বাজেটের বিশাল অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় করতে হয়। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমে যায়। ইসলামী অর্থনীতি এর পরিবর্তে অংশীদারিত্বভিত্তিক ব্যবসা, উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ এবং বাস্তব সম্পদনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর কথা বলে। ইবন তাইমিয়্যা (রহ.) বলেছেন, ‘রিবা সমাজে জুলুম ও সম্পদের অস্বাভাবিক কেন্দ্রীকরণ সৃষ্টি করে।’ (মাজমু‘ ফাতাওয়া)।

পঞ্চম নীতি হলো রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা। ইসলামে রাষ্ট্রীয় সম্পদকে জনগণের আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৭১৩৮)। ইসলামের ইতিহাসে শাসকদের জবাবদিহিতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। উমর (রা.) বলেছিলেন, ‘ফোরাত নদীর তীরে একটি কুকুরও যদি ক্ষুধায় মারা যায়, তবে উমরকে তার জবাবদিহি করতে হবে।’ (ইবনুল জাওজি, মানাকিবু উমর)।

ষষ্ঠ নীতি হলো অপচয় ও বিলাসিতা নিয়ন্ত্রণ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সূরা ইসরা, আয়াত : ২৭)। ইসলামী বাজেট দর্শনে রাষ্ট্রীয় ব্যয় হবে প্রয়োজনভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী। মহানবী (সা.) এবং খুলাফায়ে রাশেদীন ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। আবু বকর (রা.) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পরও জীবিকার জন্য বাজারে কাপড় বিক্রি করতে বের হয়েছিলেন। আলী (রা.) ব্যক্তিগত আলাপের সময় সরকারি প্রদীপ নিভিয়ে দিতেন, যাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার না হয়। এসব ঘটনা ইসলামী অর্থনৈতিক নৈতিকতার বাস্তব উদাহরণ।

সপ্তম নীতি হলো বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তা সুরক্ষা। ইসলাম অবাধ মুনাফাখোরি, মজুতদারি ও প্রতারণার বিরোধিতা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার বাজারে নিজে তদারকি করতেন এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেন। অর্থাৎ ইসলামী অর্থনীতিতে বাজারকে পুরোপুরি লাগামহীন রাখা হয়নি; বরং ন্যায়বিচার ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রকে ভূমিকা পালন করতে বলা হয়েছে।

খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ ইসলামী অর্থনীতির বাস্তব প্রয়োগের অনন্য দৃষ্টান্ত। হজরত উমর (রা.) বায়তুল মালকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। তাঁর আমলে দরিদ্র, এতিম, বিধবা ও অক্ষম মানুষদের জন্য ভাতা চালু হয়। দুর্ভিক্ষকালে রাষ্ট্রীয় কোষাগার জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল। ইতিহাসে বর্ণিত আছে, একবার দুর্ভিক্ষের সময় উমর (রা.) নিজে ঘি ও গোশত খাওয়া বন্ধ করে দেন, যতদিন না সাধারণ মানুষ স্বস্তি ফিরে পায়। এটি ছিল শাসকের সঙ্গে জনগণের দুঃখ ভাগাভাগির বিরল দৃষ্টান্ত।

আজকের বিশ্বে যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি ও ঋণনির্ভরতা বাড়ছে, তখন ইসলামের অর্থনৈতিক নীতিমালা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও এসব নীতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দরিদ্রবান্ধব করনীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় অধিক বরাদ্দ, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার, যাকাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, অপচয় কমানো এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা একটি মানবিক ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে।

মূলত ইসলাম এমন একটি বাজেটব্যবস্থা উপস্থাপন করে, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেবল সংখ্যার প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মূল্যায়িত হয়। মহানবী (সা.) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের অর্থনৈতিক দর্শন আজও একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও টেকসই রাষ্ট্রীয় বাজেটের জন্য অনন্য পথনির্দেশনা হয়ে রয়েছে।

লেখক : আলেম ও সাংবাদিক