ফুটবল বিশ্বকাপ এলে কেউ প্রিয় দলের জার্সি কেনেন, কেউ পতাকা টাঙান। কিন্তু মাগুরার কৃষক আমজাদ হোসেন প্রিয় দল জার্মানির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে বিক্রি করেছেন নিজের ১০ শতক জমি। সেই অর্থে তৈরি করেছেন সাড়ে ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা, যা এখন স্থানীয়দের বিস্ময়ের কেন্দ্রবিন্দু।
বুধবার (১০ জুন) বেলা ১১টায় সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর হাইস্কুল মাঠে আমজাদের নিজ এলাকায় এই পতাকা প্রদর্শন হয়, যা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, আমজাদ হোসেন মাগুরার সদর উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামের নেহাল উদ্দিন মোল্যার ছেলে। পেশায় একজন সাধারণ কৃষক। ১৯৮৭ সালে তিনি কঠিন রোগে আক্রান্ত হন। সে সময় অনেক রকম চিকিৎসা নিয়েও কোনো সুফল পাননি। অবশেষে মাগুরার মনোরঞ্জন কবিরাজ নামের আয়ুর্বেদিক এক চিকিৎসকের পরামর্শে জার্মানের হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সেবনের পরই তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। তারপর থেকেই আমজাদ হোসেন জার্মানের প্রতি আসক্ত হয়ে ওঠেন।
সেই সূত্র ধরেই বিশ্বকাপে জার্মান ফুটবল দলের ভক্ত হয়ে গেছেন তিনি। যার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমজাদ হোসেন নিজ খরচে তৈরি করেছেন সাড়ে ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা। এটি তৈরিতে ৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে তার।
এর আগে, ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের সময় জার্মানির সমর্থনে সাড়ে ৩ কিলোমিটারের পতাকা তৈরির জন্য তিনি প্রথম তার গ্রামের এলাহির কাছে ২০ শতক জমি বিক্রি করেন। কিন্তু সেই টাকার বেশিরভাগ অন্যকাজে খরচ হয়ে যায়। যে কারণে দ্বিতীয় দফায় তার ভাতিজা মিজানুরের কাছে ৩০ শতক জমি বিক্রি করেছেন। যার ভেতর থেকে দেড় লাখ টাকা ব্যায় করেন ওই পতাকা তৈরির জন্য। প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পতাকা তৈরির জন্য তিনি শহিদুল ইসলাম রেন্টু, জাহাঙ্গীর হোসেন ও সাইদ মোল্যা নামে তিন জন দর্জিকে এই কাজে নিয়োগ করেন। যাদেরকে মজুরি হিসেবেই দিতে হয়েছিল প্রায় ৪০ হাজার টাকা।

এবার ওই দর্জিসহ নতুন কিছু দর্জি নিয়ে তৈরি করেছেন সাড়ে ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পতাকা। যেখানে খরচ হয়েছে ২ লক্ষাধিক টাকা। এ জন্য এবার তিনি ১০ শতক জমি বিক্রি করেছেন। তবে টাকা খরচের বিষয় নিয়ে তিনি মোটেই চিন্তিত নন। জার্মান বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হলে বরং আরও বেশি টাকা খরচ করে জমকালো অনুষ্ঠান করবেন বলে জানিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে আমজাদ জানান, এই পতাকা অভিযান চলবেই। এ বছর বিশ্বকাপে জার্মানি চ্যাম্পিয়ান হলে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে তিনগুণ অর্থাৎ ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা বানাবেন তিনি। যা মাগুরা ভায়না থেকে সীমাখালী পর্যন্ত পথজুড়ে প্রদর্শিত হবে।
আমজাদ মনে করেন, তার পতাকার তৈরির বিষয়টি বিশ্বে বাংলাদেশকে নতুন এক পরিচয়ে পরিচিত করছে। তা হচ্ছে এদেশের মানুষের ফুটবলপ্রেম।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালে জার্মানি ফুটবলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত নিজে মাগুরার ঘোড়ামারা গ্রামে কৃষক আমজাদের বাড়িতে ছুটে এসেছিলেন। ১২ জুলাই ২০১৪ সালে জার্মান চার্জ দ্য আফেয়ার্স ড. ফার্দিনান্দ ফন ফার্সি ওয়েহে তাকে মাগুরা স্টেডিয়ামে জার্মানের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা ও লিখিতভাবে জার্মান ফ্যান ক্লাবের সদস্য পদ দেন। পরবর্তীতে জার্মান দলের জয়ে আমজাদ হোসেন গণভোজের আয়োজন করেন। যা বাংলাদেশ, জার্মান ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হয়।