Image description

ফোর্বসের প্রোফাইলে দেখাচ্ছে, ভদ্রলোকের ‘নেট ওয়ার্থ’- ২.১ মার্কিন বিলিয়ন ডলার। এই প্রতিবেদন লেখার সময়, রিয়েল টাইম বিলিয়নিয়ার বা ধনকুবেরদের মধ্যে তার অবস্থান ১৯৯৫তম। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভারতে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণার পর তার প্রতিষ্ঠান এয়ারট্রাংকের নাম ছাপিয়ে আলোচনার ফ্ল্যাশলাইট এখন পুরোটাই তার দিকে। অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হলেও, জন্মসূত্রে যে তিনি বাংলাদেশি! তার নাম—রবিন খুদা। জীবনের শুরু থেকে এগিয়ে পেশা, উত্থান, সাফল্য; সেগুলোও গল্পের মতো অবশ্যই।

 

এই মুহূর্তে যে ঘটনার জন্য রবিন খুদাকে নিয়ে আলাপ-আলোচনা তুঙ্গে, সেটি প্রতিবেশী দেশ ভারতে তার প্রতিষ্ঠানের একটি বিনিয়োগের ঘোষণা থেকে। দেশটিতে বিপুল পরিমাণে অর্থ বিনিয়োগ করতে চলেছে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক ডেটা সেন্টার সংস্থা এয়ারট্রাংক। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের পর সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও রবিন খুদা জানিয়েছেন, ভারতে প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে চলেছেন তারা। অন্যদিকে মোদি জানিয়েছেন, এয়ারট্রাংকের এই বিনিয়োগ ভারতের ডিজিটাল কাঠামোর ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বৃহত্তম বিনিয়োগগুলোর অন্যতম। সংস্থাটি দেশে ৫ গিগাওয়াট ডেটা সেন্টার ক্ষমতা গড়ে তুলবে।

 

রবিন খুদা ২০১৫ সালে এয়ারট্রাংক প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি অস্ট্রেলিয়া, হংকং, জাপান, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব এবং সিঙ্গাপুরে ডেটা সেন্টার স্থাপন করেছে। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন এবং কানাডা পেনসন প্ল্যান ইনভেস্টমেন্ট বোর্ডের নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়ামের কাছে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তিতে এয়ারট্রাংক অধিগ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হলেও রবিন এখন আর এককভাবে এর মালিক নন। তবে তিনি এখনও কোম্পানিটির একটি মূল্যবান অংশীদারত্ব ধরে রেখেছেন।

 

এয়ারট্রাংক প্রতিষ্ঠার আগে তিনি পাইপ নেটওয়ার্কস, ফুজিৎসু এবং সিংটেল ওপটাসের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বস্থানীয় বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রযুক্তি খাতের বাইরে, আবাসন ব্যবসাতেও রয়েছে তার নাম। ওনডাস নামের একটি বিলাসবহুল প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট রয়েছে তার, মেলবোর্ন এবং সিডনিতে যার দেখা মেলে। অস্ট্রেলিয়াতে এখন তিনি ৩৬তম ধনী ব্যক্তি। তবে বেশ বিচিত্র ব্যাপারই বলতে হয়, অস্ট্রেলিয়ায় তিনি ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছেন—ব্যাপারটি তেমনও না। স্কুল-কলেজের পড়ালেখা শেষ করেছেন বাংলাদেশে, এরপরই তার অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানো।

 

১৯৯৭ সালে রবিন খুদা বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, সিডনিতে গ্র্যাজুয়েশন করেন। এরপর তিনি ডেটা সেন্টারে কাজের মাধ্যমে ক্যারিয়ার এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। সেই সময়টায় প্রযুক্তি বিশ্বের পৃথিবী ক্লাউডের দিকে ঝুঁকছে একটু একটু করে। যত বড় বড় টেক জায়ান্ট, সবারই তখন ডেটা সংরক্ষণের জন্য দরকার বড় ডেটা সেন্টার। কিন্তু সেভাবে কেউ সেটি সংস্থান করতে পেরে ওঠেনি। রবিন এখানেই বাজারটা এবং সেইসঙ্গে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাটা ধরতে পেরেছিলেন। তিনি চাকরি ছেড়ে একেবারে খসড়া চেহারায় প্রতিষ্ঠা করেন এয়ারট্রাং, যেটি আজকের বিশাল অর্থকড়ির এক প্রতিষ্ঠান। রবিনের পরিকল্পনা ছিল, টেক জায়ান্টদের পিচ করে বড় কাজ করবেন। আর প্রথম দফাতেই মাইক্রোসফটকে পিচ করে কাজ পেয়ে যায় তার প্রতিষ্ঠান।

 

সমস্যা বেঁধে যায় অন্যখানে। রবিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী যে সেটআপ, তার জন্য প্রয়োজন ছিল ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। একটা নতুন উদ্যোক্তার নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য এই পরিমাণ অর্থ কে বা দিতে যাবে? রবিন ঘুরতে থাকেন বিভিন্ন জায়গায়। এভাবে কেটে যায় ১৩ মাস। নিজের সঞ্চয়, টাকাপয়সা সব শেষ করে তিনি যখন সংগ্রাম করে যাচ্ছেন; এমন সময় গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো প্রতিষ্ঠান রবিনের প্রতিষ্ঠানের ওপর ভরসা করে এবং প্রয়োজনীয় লোন দিয়ে দেয়। এর পরের গল্প শুধুই সাফল্যের, যেখান থেকে তাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। কারণ তার নজর আর বিনিয়োগ ছিল অন্য স্তরের। তিনি বিশাল এবং কাস্টমাইজড সব ডেটা সেন্টার তৈরি করেন, যেগুলো বিশেষভাবে টেক জায়ান্টদের জন্যই তৈরি করা ছিল। এরপর তিনি এশিয়ায় তার ব্যবসার আরও সম্প্রসারণ করেন।

 

রবিন খুদার এই বিস্ময়কর উত্থান নিয়ে আলাপে ফোর্বস অস্ট্রেলিয়া তাকে তুলনা করেছে এক দুঃসাহসী জুয়াড়ির মতো, যে নিজের সর্বস্ব বাজি ধরেছে শুধুমাত্র নিজের আইডিয়ার ওপর বিশ্বাস রেখে। হ্যাঁ, তিনি নিজের ঘর-বাড়ি, সেভিংস, আয়—সবকিছু দিয়ে এয়ারট্রাংককে গড়েছেন, চালিয়েছেন। প্রায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার জায়গা থেকে সাফল্য পেয়ে হয়েছেন বিপুল অর্থকড়ির মালিক। সেখানেই তিনি শুধু সাফল্য নন, অনুপ্রেরণারও এক নাম।