দেশের আইনজীবী সমিতিগুলোর নির্বাচনে এবার ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। বেশির ভাগ জায়গায় জয় পেয়েছেন ক্ষমতাসীন বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা। কোথাও কোথাও আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা বিজয়ী হলেও, অনেক জায়গায় তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের আমলে পরোক্ষভাবে হুমকি দিয়ে প্রতিপক্ষকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখা হতো। আর এখন প্রত্যক্ষভাবেই নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বীদের। এমন চর্চা শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব। এই নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ উচিত বলে মনে করেন তারা।
২০২৬-২৭ সেশনে সুপ্রিম কোর্টসহ সারা দেশে ৪৯টি আইনজীবী সমিতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটিতে গত বছর এবং বাকিগুলোতে চলতি বছর ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। ১৭টি সমিতিতে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা অংশ নিয়েছেন, আটটিতে আংশিকভাবে বা কয়েকটি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। আর ২৪টিতে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
ভোটের ফলাফলে দেখা যায়, ৯টিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ পদে জয় পেয়েছেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। বাকিগুলোতেও বিভিন্ন পদে বিজয়ী হয়েছেন তারা।
সর্বশেষ গত ১৬ এপ্রিল পিরোজপুর জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ১৩টি পদের মধ্যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সাতটিতে জয় পান আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। এরপর থেকে তাদের আর কোনো আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।
মাদারীপুরে ১৫টি পদের মধ্যে ১৩টিতে জয়লাভ করেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। সভাপতি ও আপ্যায়ন-সংস্কৃতি সম্পাদক পদ পান জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা।
নোয়াখালীতে সাধারণ সম্পাদকসহ ৯টি পদে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা জেতেন। সভাপতিসহ পাঁচটি পদে বিএনপি এবং একটিতে জামায়াত বিজয়ী হয়।
সিলেটে সাধারণ সম্পাদকসহ ১০টি পদে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা জয় পান। সভাপতিসহ সাতটি পদে বিএনপিপন্থি এবং তিনটিতে জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা বিজয়ী হন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৫টি পদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদকসহ ৯টিতে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা জয় পান, বিএনপিপন্থিরা পান পাঁচটি। লক্ষ্মীপুরে কোনো প্যানেল না দিয়েও ১৫টি পদের মধ্যে আটটিতে জয়ী হন আওয়ামীপন্থিরা।
কক্সবাজারে ১৭টি পদের সাতটিতে আওয়ামীপন্থি, চারটিতে বিএনপিপন্থি এবং ছয়টিতে জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা জয় পান। ঠাকুরগাঁওয়ে ১২টি পদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদকসহ পাঁচটিতে আওয়ামীপন্থি এবং সভাপতিসহ সাতটিতে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা জয় পান।
পিরোজপুরে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সাতটি পদে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা বিজয়ী হন। বিএনপিপন্থিরা পান বাকি ছয়টি পদ।
এ ছাড়া ফরিদপুরে চারটি, কুষ্টিয়ায় তিনটি, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ ও কুমিল্লায় দুটি করে এবং সুনামগঞ্জে সাধারণ সম্পাদক পদে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা জয়লাভ করেন।
বাংলাদেশ জাতীয় আইনজীবী সমিতির সভাপতি শাহ মো. খসরুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের সমান সুযোগ থাকা উচিত। পৃথিবীর কোনো দেশে আইনজীবী সমিতির নির্বাচন রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে এটা প্রচলিত হয়ে গেছে।’
১৬ এপ্রিল পরবর্তী নির্বাচন
গত ১৬ এপ্রিলের পর থেকে সারা দেশে ২৬টি আইনজীবী সমিতির নির্বাচন হয়েছে। এর ২৩টিতে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা জয় পেয়েছেন। ১০টিতে সব পদে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। মাদারীপুরসহ পাঁচ জেলায় জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা এক বা একাধিক পদ পেয়েছেন।
শরীয়তপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, চাঁদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, মেহেরপুর, পাবনা, টাঙ্গাইল ও মুন্সীগঞ্জে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এই ১০টি সমিতিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। বরিশালসহ কয়েকটি জেলায় আওয়ামীপন্থি আইনজীবী নেতাদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।
গত ২৯ থেকে ৩০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত অ্যাডহক কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, বারের সভাপতির অনুমতি ছাড়া কেউ নির্বাচন করতে পারবেন না। ভোটের ঠিক আগে নেওয়া এই সিদ্ধান্তে আওয়ামীপন্থি ১৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। ফলে ২৪টি পদের মধ্যে ২৩টিতে বিএনপিপন্থি এবং একটিতে জামায়াতের প্রার্থী জয়লাভ করেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে পরোক্ষভাবে হুমকি দিয়ে প্রতিপক্ষকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখা হতো। আর এখন প্রত্যক্ষভাবেই নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বীদের।’
সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচন
প্রায় দুই বছর পর গত মাসে অনুষ্ঠিত হয় সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচন। সেখানেও আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা ভোটে অংশ নিতে পারেননি।
গত ২৬ এপ্রিল অ্যাসোসিয়েশনের বিশেষ সাধারণ সভায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার যুক্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপরও অনেকে স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। কিন্তু বাছাই কমিটি আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ৪২ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেয়।
দলীয় প্রার্থীরা বাদ পড়ায় আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা নির্বাচন বয়কট করেন। তার প্রভাব পড়ে ভোটার উপস্থিতিতে। ১১ হাজার ৯৭ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দেন চার হাজার ৪৮ জন। শেষ পর্যন্ত ১৪টি পদের মধ্যে ১৩টিতে জয় পান বিএনপিপন্থিরা। একটি সদস্যপদ পায় জামায়াতপন্থিরা।
সামগ্রিক বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাংলাদেশ জাতীয় আইনজীবী সমিতির সভাপতি শাহ মো. খসরুজ্জামান বলেন, ‘যেহেতু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম আইনগতভাবে নিষিদ্ধ, ফলে অন্যরা এই বিষয়টি সামনে এনে দলটির সমর্থিত প্যানেল দেওয়ার বিরোধিতা করছেন।’
জুলাই অভ্যুত্থানের পর সুপ্রিম কোর্টে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। এখন তাদের একাংশ নিয়মিত বিভিন্ন মামলা লড়ছেন। তারাই মূলত এবার নির্বাচনে অংশ নিতে চেয়েছিলেন। বিশেষ সাধারণ সভার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজন মানববন্ধন করলেও জোরালো কোনো প্রতিবাদ হয়নি।
উদ্বেগ প্রকাশ করে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, ‘আইনজীবী সমিতির নির্বাচন বিচারাঙ্গনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে যদি এমন অগণতান্ত্রিক আচরণ ও স্বেচ্ছাচারিতা জেঁকে বসে, তাহলে বিচারাঙ্গনের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়া অবশ্যম্ভাবী। ক্ষমতাসীনদের এ বিষয়টি বুঝতে হবে।’