দেশের জনস্বাস্থ্যের সামনে এখন একসঙ্গে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—হাম ও ডেঙ্গু। কয়েক মাস ধরে চলা হামের প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরো পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে এক হাজার ১৬৮ জন, নতুন ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৯৩ জন এবং নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ২৪৩ জনের।
গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ৫১৯ শিশুর। নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৯১ জনের।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক মাসে হাম পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। ১ মে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা ছিল এক হাজার ১৭০। ৮ মে ছিল এক হাজার ২১২, ১৫ মে এক হাজার ১৯২, ২২ মে এক হাজার ২৬১ এবং ৫ জুন এক হাজার ১৬৮ জন।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছে, টিকাদান কর্মসূচির সুফল পেতে আরো কিছু সময় লাগবে। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আরেক অংশ বলছে, আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে না কমায় এখনই স্বস্তির সুযোগ নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগেও প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা ছিল এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ জনের মধ্যে। বর্তমানে তা এক হাজার ১০০ জনের কাছাকাছি নেমে এসেছে। তাঁর মতে, মে মাসে পরিচালিত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির সুফল জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে আরো স্পষ্টভাবে দেখা যাবে।
অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিটি মৃত্যুই আমাদের কাছে অত্যন্ত বেদনার। তবে পরিসংখ্যান বলছে, নিশ্চিতভাবে হামের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। তবে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘একটি বিষয় আমাদের বুঝতে হবে, হাম হওয়ার পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বড় জটিলতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে নিউমোনিয়া। মূলত নিউমোনিয়া এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক শারীরিক জটিলতা ঠিকমতো মোকাবেলা করতে না পারার কারণেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। আশার কথা হলো, এই মৃত্যুর সংখ্যাও ঈদের আগের তুলনায় এখন অনেক কমে এসেছে।’
ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে যে হামের বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করেছিলাম, তার মূল কার্যক্রম গত ২০ মে শেষ হয়েছে। রুটিন টিকাদান কর্মসূচি এখনো চলমান। বিজ্ঞানসম্মতভাবে টিকা দেওয়ার পর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হতে অন্তত দুই থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে। সেই হিসাবে, যারা মে মাসের মাঝামাঝি বা ২০ তারিখে টিকা পেয়েছে, তাদের পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত হতে জুন মাসের ১৫ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসিক
ও প্যারা-ক্লিনিক্যাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, হামের টিকা নেওয়ার পর শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুর মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হলে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহের পর পরিস্থিতির উন্নতি আরো দৃশ্যমান হবে।
আশাবাদের বিপরীতে উদ্বেগও রয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল মনে করেন, সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তিনি বলেন, গত এক মাসে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা বা ভর্তির হার তেমন কমেনি। তাঁর মতে, টিকাদান কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় মাইক্রো-প্ল্যানিংয়ের অভাব, পর্যাপ্ত প্রচারণার ঘাটতি এবং অনেক এলাকায় কাঙ্ক্ষিত টিকা কাভারেজ অর্জিত না হওয়ায় সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
এদিকে হাম পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৭ জেলায় এরই মধ্যে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯১ জন। চলতি বছর এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে তিন হাজার ৫৫০ জন এবং মারা গেছে ছয়জন। মাসভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, জানুয়ারিতে আক্রান্ত ছিল এক হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯ জন, মার্চে ৩৫৩ জন, এপ্রিলে ৬৪০ জন, মে মাসে ৭১৪ জন এবং গত চার দিনে আক্রান্ত হয়েছে ৩৫৩ জন।
ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের প্রায় ৭৬ শতাংশ ঢাকার বাইরের বাসিন্দা। সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, কক্সবাজারসহ কয়েকটি জেলায়। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু পাঁচটি জেলা চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরে ঢাকার বাইরের মোট রোগীর প্রায় ৪১ শতাংশ পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর প্রকৃতি এখন আর মৌসুমি নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণ আবহাওয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে সারা বছরই ডেঙ্গুর ঝুঁকি থাকছে। ফলে বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই রোগী বাড়তে শুরু করেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার কালের কণ্ঠকে বলেন, সাম্প্রতিক মাঠ জরিপে ঢাকার অনেক এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব অত্যন্ত উদ্বেগজনক মাত্রায় পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ ৯৩ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যেখানে ২০-এর বেশি হলেই তা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর মতে, চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের চেয়েও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, গত প্রায় দুই বছর নিয়মিত জাতীয় এডিস জরিপ হয়নি। ফলে কোথায় মশার ঘনত্ব বাড়ছে, কোন এলাকা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।