২০২৬-২০২৭ মেয়াদের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এটি দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি অনেক বড় অর্জন।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের সভাপতি জাতিসংঘের কর্মচারী নন এবং তিনি জাতিসংঘ থেকে বেতনও পান না। সভাপতির অফিস পরিচালনার জন্য জাতিসংঘ সীমিত বাজেট দিলেও বাস্তবে অধিকাংশ ব্যয় বহন করে সভাপতির নিজ দেশ এবং বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের স্বেচ্ছা অনুদান।
জাতিসংঘ কত অর্থ দেয়
বর্তমানে সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের অফিসের জন্য জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটে বছরে ২ লাখ ৫৩ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার বরাদ্দ রয়েছে।
তুলনামূলকভাবে দেখলে, জাতিসংঘের ২০২৬ সালের মোট নিয়মিত বাজেট ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার হলেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অফিসের জন্য বরাদ্দ সেই বাজেটের খুবই ক্ষুদ্র অংশ।
বাস্তবে ব্যয় কোথায় হয়
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয় পরিচালনার জন্য সাধারণত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপদেষ্টা, আইনি ও নীতি বিশ্লেষক, মিডিয়া ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা টিম, আন্তর্জাতিক সফর ও প্রতিনিধিদল পরিচালনা, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও সম্মেলন আয়োজনের প্রয়োজন হয়। এসব কর্মকাণ্ডে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সভাপতির নিজ দেশ সভাপতির বেতন, আবাসন, অতিরিক্ত জনবল ও অন্যান্য ব্যয় বহন করে থাকে। বিভিন্ন বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অধিকাংশ সাধারণ পরিষদের অফিস জাতিসংঘের বরাদ্দের পাশাপাশি ট্রাস্ট ফান্ড এবং নিজ দেশের সহায়তার ওপর নির্ভর করে।
অতীতের অভিজ্ঞতা কী বলে
৮০তম অধিবেশনের সভাপতির কার্যালয়ের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ট্রাস্ট ফান্ডে ২০২৫-২৬ সময়ে প্রায় ২১ লাখ ডলারের বেশি অনুদান জমা হয়েছে। জার্মানি, চীন, কাতার, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ এ তহবিলে অর্থ দিয়েছে।
এর অর্থ হলো, জাতিসংঘের নিয়মিত বরাদ্দের বাইরে কার্যকর প্রেসিডেন্সি পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত কয়েক মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য ব্যয় কত
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনের জন্য জাতিসংঘ থেকে কোনো নির্দিষ্ট বেতন বা ফি প্রদান করা হয় না। সভাপতির মূল বেতন ও বাসস্থান তার নিজের দেশ বহন করে থাকে। বর্তমান ৮০তম অধিবেশনের সভাপতি জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যানালেনা বেয়ারবক। তার ক্ষেত্রে জার্মান সরকার মাসিক প্রায় ১৩ হাজার ইউরো ব্যয় করে থাকে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বাংলানিউজকে বলেন, জাতিসংঘের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালনে বেশ অর্থ ব্যয় হতে পারে। অতীতে সব দেশের ক্ষেত্রেও এটাই হয়েছে। সীমিত পরিসরে ১২ থেকে ১৫ লাখ ডলার, মধ্যম পরিসরে ২০ থেকে ৩০ লাখ ডলার। উচ্চপর্যায়ে ৩০ থেকে ৫০ লাখ ডলার বা তার চেয়েও বেশি খরচ হতে পারে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এর পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ১২ কোটি থেকে ৬০ কোটি টাকা।
কেন ব্যয় বাড়তে পারে
বাংলাদেশ যদি রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু অর্থায়ন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থ এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আয়োজন করে, তাহলে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে নিউইয়র্কে অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, আন্তর্জাতিক সফর এবং বড় আকারের কূটনৈতিক উদ্যোগের কারণে ব্যয় কয়েক কোটি টাকা বৃদ্ধি পাওয়া অস্বাভাবিক হবে না।
ব্যয় নাকি বিনিয়োগ?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বাংলানিউজকে বলেন, এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যয় নয়; বরং বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। কারণ এক বছরের জন্য জাতিসংঘের সর্ববৃহৎ পরামর্শমূলক সংস্থার সভাপতিত্ব দেশকে বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
এর মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়ন, উন্নয়ন সহযোগিতা, বিনিয়োগ আকর্ষণ, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের নতুন সুযোগ পেতে পারে।
কিভাবে এই ব্যয় মেটানো হবে
বাংলাদেশ সরকার এখনো ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব উপলক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক বাজেট ঘোষণা করেনি, তবে অতীতের অভিজ্ঞতা ও জাতিসংঘের আর্থিক কাঠামো বিবেচনায় বাংলাদেশকে প্রায় ১২ থেকে ৫০ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হতে পারে। তবে এর একটি অংশ আন্তর্জাতিক অনুদান ও ট্রাস্ট ফান্ড থেকেও আসতে পারে। তবে কত অংশ বাংলাদেশকে দিতে হবে, আর কত অংশ আন্তর্জাতিক অংশীদাররা দেবে, সেটা চূড়ান্ত নয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এই ব্যয়কে শুধু খরচ হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রভাব ও মর্যাদা বৃদ্ধির একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবেও দেখতে হবে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির কাজ কী?
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক পদ। সভাপতি সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনা এবং ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ঐকমত্য গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সভাপতির প্রধান দায়িত্ব হলো সাধারণ পরিষদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন পরিচালনা। তিনি আলোচনার কার্যক্রম পরিচালনা, বক্তাদের তালিকা অনুমোদন এবং কার্যপ্রণালি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা ও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন।
সভাপতি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলন, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে সাধারণ পরিষদের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি অধিবেশন চলাকালে বিভিন্ন বিশেষ ও উচ্চপর্যায়ের সভা, থিমেটিক বিতর্ক এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলন আহ্বান ও পরিচালনা করেন।
তিনি বিভিন্ন আঞ্চলিক গ্রুপ, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ, ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ করেন। যদিও সভাপতির নির্বাহী ক্ষমতা নেই, তিনি গৃহীত প্রস্তাব ও সিদ্ধান্তগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সম্পৃক্ত রাখার কাজ করেন।
কেন পদটি গুরুত্বপূর্ণ?
সাধারণ পরিষদের সভাপতি এক বছরের জন্য নির্বাচিত হন এবং তাকে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। ফলে এই পদটি বৈশ্বিক কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধনকারী ও ঐকমত্য-নির্মাতার ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাকে জাতিসংঘের সর্ববৃহৎ নীতিনির্ধারণী ফোরামের কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমঝোতা করতে হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও থাকছেন খলিলুর রহমান?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আগামী ৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তিনি এক বছর মেয়াদের জন্য এই সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পদে দায়িত্ব পালন করবেন।
নীতিগতভাবে একজন ব্যক্তি একইসঙ্গে কোনো দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। জাতিসংঘের সনদ বা সাধারণ পরিষদের কার্যবিধিতে এ ধরনের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে খলিলুর রহমান কী করবেন, সেটা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বুধবার (৩ জুন) পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকবেন কি না, সেটা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত। আমি মনে করি, এটা ওনাদের দু'জনের (তারেক রহমান ও খলিলুর রহমানের) সিদ্ধান্তে হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে যদি নিবেদিতভাবে ওনার এই কাজটা করতে হয় (জাতিসংঘের সভাপতির কাজ), তাহলে ওখানে (জাতিসংঘে) সময়টা দিতেই হবে। তার মানে এই নয় যে, উনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এটা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত। আমি মনে করি, এটা ওনাদের দুজনের (প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী) সিদ্ধান্তে হবে।