যে বাড়িতে এত বছর পর প্রবাসফেরত ছেলেকে ঘিরে আনন্দ-উৎসবের প্রস্তুতি চলছিল, নতুন পুত্রবধূকে বরণ করার স্বপ্ন বোনা হচ্ছিল, সেই বাড়ির উঠোনে এখন সারিবদ্ধ চারটি খাটিয়া। স্বজনদের কান্না আর শোকাহত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। এক সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে নিভিয়ে দিয়েছে একটি পরিবারের সব আলো।
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা উজ্জ্বলপুর গ্রামের শহিদুল ইসলামের পরিবারটি ছিল সংগ্রাম আর স্বপ্নের মিশেলে গড়া। অভাব-অনটনের সংসারে বড় ছেলে আরিফ ইসলাম ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে বড় আশার নাম। প্রায় ১০ বছর আগে পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা ঘোচাতে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে একে একে শোধ করেছেন পরিবারের ঋণ, এগিয়ে নিয়েছেন সংসারের নানা কাজ।
দীর্ঘ এক দশক পর তিন মাসের ছুটিতে দেশে ফিরেছিলেন আরিফ। পরিবারের সদস্যদের কাছে তার এই ফেরা ছিল ঈদের আনন্দের চেয়েও বড়। দেশে ফিরে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে পরিবারের সঙ্গে থাকার পরিকল্পনাও ছিল তার। সেই উপলক্ষে বাড়িতে চলছিল নানা প্রস্তুতি। কিন্তু নিয়তি যেন অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
মঙ্গলবার (২ জুন) ভোরে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আরিফ ইসলাম, তার মা নুর জাহান, ছোট ভাই রাকিব ও বোন আয়েশা খাতুন। একই দুর্ঘটনায় নিহত হন প্রাইভেটকার চালকও। গুরুতর আহত হয় আয়েশার দুই শিশুসন্তান।
এক মুহূর্তে পরিবারটির চিত্র পাল্টে যায়। যে আরিফকে বরণ করে নিতে পরিবারের সদস্যরা বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন, সেই আরিফই আর জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারেননি। সঙ্গে প্রাণ হারান তাকে বরণ করতে যাওয়া মা, ভাই ও বোন।
এই দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে পরিবারের কর্তা শহিদুল ইসলামের ওপর। জীবনের শেষ বয়সে এসে তিনি হারিয়েছেন স্ত্রী, দুই ছেলে ও একমাত্র মেয়েকে। যে মানুষটি ভোর পর্যন্ত ছেলের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন, কয়েক ঘণ্টা পর তাকেই সন্তানদের লাশ গ্রহণের প্রস্তুতি নিতে হয়েছে।
পরিবারটির অর্থনৈতিক ভিত্তিও প্রায় ধসে পড়েছে। প্রবাসী আরিফ ছিলেন সংসারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ছোট ছেলে রাকিবও ছিল পরিবারের ভবিষ্যৎ ভরসা। একসঙ্গে দুই কর্মক্ষম সন্তানকে হারিয়ে পরিবারটি অর্থনৈতিকভাবেও চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে নিহত আয়েশা খাতুনের দুই অবুঝ সন্তান এখন মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত। দুর্ঘটনায় আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা শিশু দুটি এখনও বুঝে উঠতে পারেনি তাদের জীবনে কী ভয়াবহ শূন্যতা নেমে এসেছে। স্ত্রী হারিয়ে তাদের বাবা ইলিয়াছকেও এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
গ্রামবাসী জানায়, এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা তারা আগে কখনও দেখেননি। যে বাড়িতে বিয়ের আয়োজনের আলোচনা চলছিল, সেখানে এখন চলছে জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি। আনন্দের অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলো মুহূর্তেই শোকের সাগরে ডুবে গেছে।
ভাঙ্গা থানায় নিহত আয়েশার স্বামী ইলিয়াছের দায়ের করা এজাহার থেকে জানা গেছে, ঢাকা থেকে যশোরগামী প্রাইভেটকারটি এক্সপ্রেসওয়ের ভাঙ্গামুখী লেনের মালিগ্রাম নামক স্থানে পৌঁছালে অন্ধকার সড়কে কোনো ব্যারিয়ার বা সংকেত ছাড়া অবৈধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি ট্রাকের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার তীব্রতায় প্রাইভেটকারটি দুমড়েমুচড়ে ট্রাকের নিচে ঢুকে যায়।
ঘটনাস্থলেই আয়েশা, নুর জাহান, আরিফ ও চালক জাহিদ মারা যান। গুরুতর আহত রাকিবকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকেও মৃত ঘোষণা করেন। দুর্ঘটনার পরপরই অজ্ঞাতনামা ট্রাকচালক গাড়ি রেখে পালিয়ে যায়।
নিহত আয়েশার স্বামী ও মামলার বাদী ইলিয়াছ বলেন, অভাব ঘোচাতে আরিফ মালয়েশিয়ায় ছিলেন। এবার দেশে ফিরে বিয়ে করবে বলে পুরো আয়োজন চলছিল। তাকে আনতে ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে শাশুড়ি, আমার স্ত্রী, দুই শ্যালক ও আমার দুই শিশুসন্তান বিমানবন্দরে যায়। গাড়িতে জায়গা না হওয়ায় আমি সঙ্গে যেতে পারিনি। আমার শ্বশুর ছাড়া এই সংসারে আর কেউ বেঁচে রইল না। পথেই সব শেষ হয়ে গেল।