Image description

‘ক্যাম্পে থাকতে হলে মাদক বিক্রি করতে হবে। না হলে ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাও, না হয় মরো।

’—এমন হুমকি পেয়ে থানা পুলিশের সহযোগিতা চান এক নারী। তবে এতেও রক্ষা হয়নি। মাদক বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা তাঁর বাসায় হামলা চালায়।  মারধর করে লুটে নেয় মালপত্র।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশের কাছে অভিযোগ দেওয়ায় সন্ত্রাসীরা আরো ক্ষিপ্ত হয়। প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে তারা।’ 

এমন পরিস্থিতিতে সরেজমিনে রাজধানীর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, পুলিশের তালিকাভুক্তদের মধ্যে শীর্ষ ছয় গডফাদারকে ঘিরে জেনেভা ক্যাম্পে সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। তাঁরা হলেন মনু ওরফে গালকাটা মনু, সালাম, নেটা সেলিম, ইরফান, লালন ও ইমতিয়াজ।

তাঁদের দুই শতাধিক সহযোগী ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় ঘুরে ঘুরে অনেকটা প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করে।

ক্যাম্পে গিয়ে একাধিক জায়গায় লাইন ধরে মাদকসেবীদের বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য কিনতে দেখা যায়। এদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দীন কালের কণ্ঠকে বলেন, জেনেভা ক্যাম্পের মাদক গডফাদারদের মধ্যে অনেকে এরই মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে। বর্তমানে মনু ওরফে গালকাটা মনু, সালাম, নেটা সেলিম, ইরফান, লালন ও ইমতিয়াজসহ শীর্ষ কারবারিরা ক্যাম্পের মাদক নিয়ন্ত্রণ করছে বলে তথ্য রয়েছে। তারা থানার তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি।

তাদের ধরতে অভিযান চলছে।

এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদক গডফাদাররা আধিপত্য ধরে রাখতে ক্যাম্পে তাদের সহযোগীদের দিয়ে বিপুল অস্ত্র মজুদ করেছে। এতে প্রায়ই বেধে যাচ্ছে সংঘর্ষ। এর জেরে প্রাণ যাচ্ছে এলাকার নিরীহ মানুষের।

সর্বশেষ বিহারি ক্যাম্প এলাকায় এক বাড়িতে হামলা চালিয়ে নগদ টাকাসহ মালপত্র লুট করার অভিযোগ পাওয়া গেছে স্থানীয় মাদক সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ দিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার। মোহাম্মদপুর থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী নারী বলেন, ক্যাম্পের উল্টা সালাম, কালা রাজু, ইরফান, নেতা সমির ও কালাকা সমির কিছুদিন ধরে তাঁকে মাদক বিক্রির জন্য চাপ দেয়। এতে আপত্তি জানালে তারা তাঁকে হুমকি-ধমকি দেয়। এরপর তারা তাঁর বাসায় অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাঁর বাসা থেকে নগদ ৫০ হাজার টাকা, এক জোড়া কানের দুল, একটি গলার চেইন ও তিনটি মোবাইল ফোনসেটসহ গুরুত্বপূর্ণ আসবাব নিয়ে যায়। এরপর পরিবারসহ তাঁকে বাসা থেকে জোরপূর্বক বের করে তালা লাগিয়ে দেয়। তারা হুমকি দিয়ে বলে, প্রশাসনের সহায়তা নিলে তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের পুনরায় মারধর করাসহ প্রাণে মেরে ফেলা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এক আতঙ্কের জনপদ। শুধু মাদক কারবারই নয়, প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে এ এলাকায়। এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কের মধ্যে থাকে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানে কিছুদিনের জন্য স্বস্ত্তি এলে পরিস্থিতি আবার আগের মতো হয়ে যায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সিসিটিভি ক্যামেরা : পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পসহ আশপাশ এলাকা সার্বিক অপরাধমুলক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে পুলিশ।

সর্বশেষ গত সোমবার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে বিশেষ অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। মাদক অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে চার ঘণ্টাব্যাপী এই বিশেষ অভিযানে ১৬ জনকে আটক করা  হয়। তবে এদের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের গডফাদার মাদক কারবারি নেই বলে মোহাম্মদপুর থানার ওসি জানান।

মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ সূত্র নিশ্চিত করেছে, মাদকবিরোধী অভিযানে কর্মকর্তাসহ পুলিশের পক্ষ থেকে প্রায় ২০০ জন সদস্য অংশ নেন। সব মিলিয়ে তিন বাহিনীর ৩৫০ সদস্য এই অভিযানে অংশ নেন।

ঘটা করে এমন বিশাল অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্যাম্পের স্থানীয় বাসিন্দারা। নাম  প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারিরা আগে থেকেই অভিযানের খবর পেয়ে যায়। ফলে মূল অভিযান শুরু হওয়ার আগেই শীর্ষ কারবারিরা সটকে পড়ে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গত ৩০ এপ্রিল থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই এই তৎপরতা বেড়েছে।

পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই সারা দেশে ১৯ হাজার ৪৯টি মাদকবিষয়ক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগর এলাকায় এক হাজার ৯৪০টি মামলা হয়েছে। বিশেষ অভিযান শুরু হওয়ার পর এক সপ্তাহে শুধু রাজধানী থেকেই অন্তত এক হাজার ২০০ জন ছোট-বড় মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকায় মাদক ও জুয়ার প্রভাব বেশি থাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। আইনের দুর্বলতার কারণে অনেক অপরাধীকে আটক করার পরও দীর্ঘ সময় জেলে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

পুলিশ ও ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সূত্রে জানা যায়, মাদক অপরাধীদের হাতে খুন হয় শাহ আলম নামের এক নিরপরাধ তরুণ। তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গত এক বছরে একই কারণে এই মাদক কারবারিরা আরো পাঁচজনকে খুন করে। তাদের চাপাতির কোপে ও গুলিতে আহত হয় অর্ধশতাধিক লোক। এর মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে।

পুলিশ বলছে, ক্যাম্পের অন্তত ৮০ শতাংশ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখন মাদকে জড়িয়ে পড়েছে। তবে ক্যাম্পের বাসিন্দারা বলছে, ক্যাম্পে দারিদ্র্যের পাশাপাশি রয়েছে বেকারত্ব। এর সুযোগ নিচ্ছে মাদক কারবারিরা। 

যাদের নিয়ন্ত্রণে জেনেভা ক্যাম্প : পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন শীর্ষ মাদক কারবারিদের মধ্যে বুনিয়া সোহেল, চুয়া সেলিম, গালকাটা মনু, শাহ আলম, ইমতিয়াজ, পিচ্চি শামির, পিচ্চি রাজা, বড় রাজু, শাহজাদা, টুনটুন ও নাদিম জেনেভা ক্যাম্পে সহযোগীদের দিয়ে মাদক কারবার চালিয়ে আসছে।

এসব শীর্ষ মাদক কারবারির মধ্যে অনেকে যৌথ বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছিল। তবে  বিভিন্ন সময়ে জামিনে বের হয়ে তাদের অনেকেই ফের আগের মতো ক্যাম্পে মাদক কারবার শুরু করে। এর মধ্যে বুনিয়া সোহেল ৩৬ মামলার আসামি। অন্যদের বিরুদ্ধেও ১০-১২টি করে মাদকদ্রব্যসংক্রান্ত মামলা রয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

ক্যাম্পের বাসিন্দারা যা বলছেন : ক্যাম্পের এক বাসিন্দা কালের কণ্ঠকে বলেন, এখনো এই ক্যাম্পের মাদক নিয়ন্ত্রণকারীদের মধ্যে বুনিয়া সোলের লোকজন ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরে মাদক কারবার করছে। আর চুয়া সেলিমের এলাকা হচ্ছে এবি-ব্লক পাক্কা (পাকা) ক্যাম্প। 

গত কয়েক দিনে সরেজমিন ক্যাম্পে গিয়ে জানা যায়, বর্তমানে শীর্ষ মাদক কারবারিদের ছয়টি গ্রুপ জেনেভা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের রয়েছে দুই শতাধিক সদস্য। এসব শীর্ষ কারবারির গ্রুপে অন্তত ৫০ জনের বেশি সদস্য রয়েছে।

মানসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী  কালের কণ্ঠকে বলেন, মাদকের দিকে আরো নজর দিতে হবে। মাদক মাফিয়াচক্র সুযোগ পেয়ে দেশব্যাপী মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে।