Image description

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার শুরু হওয়ার প্রথম দিনেই নতুন এক নাম সামনে এনেছেন প্রধান আসামি সোহেল রানা। আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের কাছে তিনি দাবি করেছেন, ধর্ষণ ও হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন ‘ডলার’ নামে আরেক ব্যক্তি। তবে দীর্ঘ তদন্তের পর পুলিশ বলছে—মামলার নথি, ফরেনসিক আলামত এবং আসামিদের জবানবন্দিতে এমন কোনও ব্যক্তির অস্তিত্ব বা সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি।

সোমবার (১ জুন) ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষে আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সামনে সোহেল রানা বলেন, ‘আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কেটেছি। ধর্ষণ করেছে ডলার।’ তিনি আরও দাবি করেন, মিরপুর-১১ এলাকার ‘ডলার’ নামে এক ব্যক্তি রামিসাকে এনে দিতে পারলে তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিলেন। একইসঙ্গে তিনি স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে নির্দোষ বলেও দাবি করেন।

সোহেলের এই বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে—কে এই ডলার? আদৌ কি এমন কোনও ব্যক্তি এই ঘটনায় জড়িত, নাকি বিচার প্রক্রিয়ার মাঝপথে এটি নতুন কোনও কৌশল?

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির বলেছেন, তদন্তে এমন কোনও ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। মঙ্গলবার (২ জুন) বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “ঘটনাস্থলে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী ছাড়া অন্য কারও উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিভিন্নভাবে আমরা বিষয়টি যাচাই করেছি। এখন সে নিজেকে বাঁচানোর জন্য নতুন গল্প তৈরি করতে পারে।”

ওসি বলেন, ‘‘সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারও তদন্তে অন্য কারও উপস্থিতির কথা বলেননি। এমনকি আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতেও সোহেল তৃতীয় কোনও ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেননি। ফলে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা বা মামলার গতিপথ ভিন্নদিকে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই নতুন এই দাবি সামনে আনা হয়েছে।’’

 

একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. অহিদুজ্জামান। তিনি আদালতকে জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং আসামিদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে চার্জশিটভুক্ত দুই আসামির বাইরে অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবে সোহেলের বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও। মঙ্গলবার (২ জুন) সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘ডলার নামে একজনের কথা আসছে, কিন্তু সে এখনও ধরা পড়েনি। আমার কাছে এ বিষয়ে কোনও তথ্য নেই।’’ তিনি আরও জানান, মামলার অধিকাংশ সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে এবং বিচারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছে।

এদিকে আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। তিনি ঘটনার দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, স্ত্রীর ফোন পেয়ে দ্রুত বাসায় ফিরে এসে দেখেন প্রতিবেশীরা জড়ো হয়েছেন। পরে দরজা ভেঙে ফ্ল্যাটে ঢুকে টয়লেটের সামনে রক্ত দেখতে পান। তিনি আদালতকে বলেন, ‘‘আমি আসামিকে জীবনেও দেখিনি।’’

মামলার এজাহার ও তদন্ত নথি অনুযায়ী, গত ১৯ মে পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার বাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসাকে কৌশলে নিজেদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না। পরে তাকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে মাথা বিচ্ছিন্ন করে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার দিনই স্বপ্নাকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করে পুলিশ এবং পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয় সোহেলকে। পরবর্তী সময়ে তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তদন্ত শেষে পুলিশ দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ১ জুন আদালত তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।

বিচার শুরুর এই পর্যায়ে এসে ‘ডলার’ নামের নতুন চরিত্রকে সামনে আনার ফলে জনমনে নতুন প্রশ্ন তৈরি হলেও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-প্রমাণে সেই দাবির কোনও ভিত্তি পাওয়া যায়নি। ফলে আদালতে উত্থাপিত এই বক্তব্য শেষ পর্যন্ত নতুন কোনও তদন্তের পথ খুলবে, নাকি এটি আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবেই বিবেচিত হবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।