পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে পাহাড়ে। রাঙ্গামাটির ২৯৯ নম্বর আসনে নির্বাচিত প্রথম ব্যক্তি, যিনি পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদ পেয়েছেন। তার দায়িত্ব পাওয়ার পর খুশি হয়েছিলেন রাঙামাটির সব দল ও মতের মানুষ। কিন্তু সেই আনন্দ বেশি দিন টেকেনি। মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় মন্ত্রিত্ব ছাড়লেন দীপেন দেওয়ান। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলেও, পার্বত্য জনপদজুড়ে বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
কেন তিনি হঠাৎ অব্যাহতি নিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সবাই। দলের নেতাকর্মীসহ পাহাড়ের বিভিন্ন মহল বলছে, অসুস্থতা কেবল অজুহাত, এ পদত্যাগের নেপথ্যে থাকতে পারে দলীয় নানা দ্বন্দ্ব। যার অন্যতম, রাঙামাটির দলীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ, তিন জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়ে বিরোধ, পাহাড়ের রাজনীতির সদর-অন্দরে নানা সমীকরণ আর মন্ত্রণালয় পরিচালনায় বিভিন্ন ইস্যু।
খোঁজ নিলে সংশ্লিষ্ট একাধিক রাজনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে অস্বস্তিতে ছিলেন। তার পদত্যাগের কারণ হিসেবে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে দূরত্ব ছিল বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে তুলে ধরছেন। অনেক ধরণা করছেন, পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন নিয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছিল।
এ বিষয়ে দীপেন দেওয়ানের ভায়রা ভাই মানস মুকুর চাকমা বলেন, নির্বাচনের আগেও দলীয় ৩১ দফা ও শহীদ জিয়ার ১৯ দফা দাবি নিয়ে পহাড়ি পথে পথে ঘুরেছেন তিনি। তার শারীরিক এমন কোনো অসুস্থতা নেই যে তাকে পদত্যাগ করতে হবে। চাপের কারণেই তিনি পদত্যাগ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আমি ঢাকায় ওনার বাসায় সকালে একসঙ্গে নাশতা করেছি। উনি ভালো আছেন। কী কারণে এই পদত্যাগ, কিছু জানার সুযোগ হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়ে বিরোধের জেরে এবং প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে মন্ত্রণালয় পরিচালনায় বিভিন্ন ইস্যু জড়িত।
দীপেন দেওয়ানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম পনির বলেন, দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করার আগেও ও পরে আমার সঙ্গে কোনো ধরনের কথা হয়নি। আমি তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম, তবে তার ফোন বন্ধ পাই। আমাদের মনে হয় স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে বাধা আসায় এই
সিদ্ধান্ত তিনি নিয়ে থাকতে পারেন।
যা বলছেন জেলার নেতারা
জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভুট্টো বলেন, মন্ত্রণালয়ে কাজের স্বাধীনতাভাবে কাজ করতে পারছিলেন না দীপেন দেওয়ান, সেটি প্রধানমন্ত্রী নিজেও জানেন। উনি ওনার মনমতো প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচলনা করতে পারছিলেন না। জেলা পরিষদ গঠন নিয়ে নানা ধরনের চাপ ছিল বলেই আমার কাছে মনে হয়। তাই
তিনি দায়িত্ব পালন থেকে সরে এসেছেন। তবে এমন ঘটনা রাঙামাটি বিএনপির জন্য ক্ষতি হয়ে গেল। এই ক্ষতিপূরণ একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর পক্ষেই সম্ভব।
এদিকে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ মেনে নিতে পারছেন না বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অংশ। সড়ক অবরোধসহ নানা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তারা। পদত্যাগপত্র ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করলেও দীপেনের অনুসারীদের আশা, তাকে পদে ফেরানোর এখনও সুযোগ আছে।
এর মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মনীষ দেওয়ানের একটি পোস্ট ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তোলপাড়। যেখানে তিনি দাবি করে বলেছেন, তাকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে বসানোর উদ্যোগ নেওয়ায় পদ ছাড়তে হয়েছে দীপেন দেওয়ানকে।
মঙ্গলবার সকালে ফেসবুকে নিজের আইডিতে দেওয়া ওই পোস্টে কেন্দ্রীয় বিএনপির উপজাতি বিষয়ক সহসম্পাদক ও অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল মনীষ দেওয়ান দাবি করে বলেছেন, রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নের সুপারিশকে কেন্দ্র করেই পদত্যাগ করতে হয়েছে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানকে।
মনীষ দেওয়ান লিখেছেন, ‘এ মুহূর্তে দেশ ও জাতির প্রয়োজনে সত্যকথনের জরুরি দরকার। দীপেন দেওয়ান তার মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন শুধুমাত্র একটি কারণে। তিনি আসন্ন রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছিলেন আমাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পার্বত্য মন্ত্রী (প্রতিমন্ত্রী) ব্যারিস্টার মীর হেলাল চেয়েছিলেন, দীপেন তালুকদার দিপু, সভাপতি, জেলা বিএনপিকে যিনি জুলাই আন্দোলনে ছয় মাস রাঙামাটি থেকে গা ঢাকা দিয়ে পলাতক ছিলেন (স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবগত ছিলেন) এবং ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন ধরনের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও কুখ্যাত আওয়ামী নেতাদের প্রশ্রয় দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন, যা রাঙামাটিবাসী সকলেই অবগত আছেন।’
যে দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পেছনে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে দূরত্ব ছিল বলে অনেকেই অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন গতকাল রাতে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দীপেন চাচার সঙ্গে আমার কোনো দূরত্ব নেই। আমাদের দুজনের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। আমার আব্বা (সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন) যখন জুডিশিয়ারিতে ছিলেন, তখন তিনি সহকর্মী ছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কখনো দূরত্ব ছিল না। পদত্যাগের বিষয়টি জানতে পেরে আমি ওনাকে ফোন করেছিলাম। কিন্তু ওনাকে পাওয়া যায়নি। তবে উনি অসুস্থ ছিলেন শুনেছি। কেন পদত্যাগ করেছেন, বুঝতে পারছি না।’
মনীষ দেওয়ানের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার বলেন, ‘আমি ওনার এই বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে চাই না। তার ব্যক্তিগত বিষয় এটি। তবে আমি চেয়ারম্যান পদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কাছে আবেদন করেছিলাম। আমার নেতা জানেন আমি কী করেছি, কোথায় ছিলাম।’
রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মামুনুর রশীদ মামুন বলেন, ‘তিনি (দীপেন দেওয়ান) কেন এমনটা করলেন, বুঝতেই পারছি না। আর যদি কোনো মান-অভিমান বা অন্য কোনো কারণ আছে কি না, সেটিও জানি না। পদত্যাগ করার আগেও দলীয় কোনো ফোরামে এই বিষয়ে তিনি আলোচনা করেননি। উনার বিরুদ্ধে জেলারও কোনো অভিযোগও ছিল না।’
২০০৫ সালে যুগ্ম জেলা জজের চাকরি ছেড়ে দীপেন দেওয়ান বিএনপিতে যোগ দেন। প্রথমবার চাকরিবিধি কারণে তিনি নির্বাচন করতে না পারায় তার স্ত্রী মৈত্রী চাকমাকে মনোনয়ন দেয় দল। তিনি পরাজিত হন। ২০১০ সালে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি হন দীপেন দেওয়ান। ২০১২ সালের কাউন্সিলে সে পদ হারান দীপেন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন বিএনপির রাজনীতিতে।
পদত্যাগের বিষয়ে কথা বলার জন্য দীপেন দেওয়ানের সঙ্গে অসংখ্যবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি তার ব্যক্তিগত সহকারীদের সঙ্গেও।
স্থানীয় নাগরিক সমাজ মনে করছে, এভাবে মন্ত্রীর পদত্যাগ যেমন বিশেষ ঘটনা, তেমনি এটি পাহাড়ের রাজনীতিতেও নানা প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে নতুন মন্ত্রী কে হচ্ছেন, পাহাড়ে এখন সে আলোচনাও জোরেশোরে চলছে।
পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন দীপেন দেওয়ান
দীপেন দেওয়ান শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন, ‘আমি দীপেন দেওয়ান, এমপি, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। দায়িত্ব গ্রহণের পর হতে আমি শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছি। আমার শারীরিক অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নানাবিধ সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধির স্বার্থে আমার বর্তমান পদ থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করা আবশ্যক বলে মনে করছি। অতএব উপর্যুক্ত কারণে আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণের জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।’
এদিকে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল রাঙামাটিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করার আহ্বান জানিয়েছেন।