Image description

উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে তীব্র তাপদাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আজ মঙ্গলবার জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রচণ্ড রোদ ও ভ্যাপসা গরমে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ ও কৃষকরা। একই সঙ্গে ফসল, সবজি এবং ফলের বাগানে ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ভোরের দিকে আবহাওয়া কিছুটা সহনীয় থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের তাপমাত্রা অসহনীয় হয়ে ওঠে। দুপুরের পর শহরের ব্যস্ত সড়কগুলো প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না অনেকেই।

সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ। জীবিকার তাগিদে রিকশা, ভ্যান, নির্মাণকাজ কিংবা কৃষিক্ষেত্রে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাদের। প্রচণ্ড গরমে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়লেও কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ নেই।

ঠাকুরগাঁও শহরের চৌরাস্তা এলাকার রিকশাচালক গুনু মিয়ার সঙ্গে কথা হয়। বললেন, ‘সকালের দিকে একটু ভালো লাগে, কিন্তু বেলা বাড়তেই রোদ এমন হয় যে রিকশা চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। ঘামে শরীর ভিজে যায়, বারবার পানি খেতে হয়। কিন্তু কাজ বন্ধ রাখলে সংসার চলবে না।’

শহরের একটি নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিক শফিকুল ইসলাম (৪২) বলেছেন, ‘দুপুরের দিকে টিনের নিচে দাঁড়ানো যায় না, আগুনের মতো লাগে। মাথা ঝিমঝিম করে, তবুও কাজ করতে হয়। দিন শেষে মজুরি না পেলে সংসার চালানো কঠিন।’

তাপপ্রবাহের প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতেও। কয়েক দিনের টানা গরমে ফসলি জমির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এতে সেচনির্ভরতা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ভুট্টা, গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং ধানের গাছ অতিরিক্ত তাপের কারণে চাপে পড়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের কৃষক মোস্তফা ইসলাম বলেছেন, ‘জমিতে আগের চেয়ে বেশি পানি দিতে হচ্ছে। মাটি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। ফসল বাঁচিয়ে রাখতে এখন সেচের ওপরই ভরসা। বৃষ্টি না হলে বিপদ বাড়বে।’

একই এলাকার কৃষক মজিবর রহমান বলেছেন, ‘মরিচ, লাউ, ঝিঙে ও বেগুনের গাছে গরমে ফুল ঝরে পড়ছে। গাছ ঠিক থাকলেও ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। এই সময়ে একটু বৃষ্টি হলে অনেক উপকার হতো।’

জেলার বিভিন্ন এলাকায় লিচু ও আমের বাগানেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। অতিরিক্ত রোদে লিচুর খোসা শক্ত হয়ে যাওয়া, ফল ফেটে যাওয়া, কালচে দাগ পড়া এবং আম ঝরে পড়ার ঘটনা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বাগান মালিকরা।

সদর উপজেলার লিচুচাষি হারুন উর রশীদ বলেছেন, ‘লিচুতে এখন গরমের প্রভাব স্পষ্ট। কিছু লিচু ফেটে যাচ্ছে, কিছুতে কালচে দাগ পড়ছে। আমও ঝরে পড়ছে। আবহাওয়া ঠান্ডা না হলে বা বৃষ্টি না হলে ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।’

তীব্র গরমের কারণে শহরে মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। বিশেষ করে হোটেল ও খাবারের দোকানগুলোতে ক্রেতা কমে গেছে।

ঠাকুরগাঁও শহরের হোটেল ব্যবসায়ী দবিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আগে দুপুরের সময় ভালো ভিড় থাকত। কয়েক দিন ধরে গরমের কারণে লোকজন কম বের হচ্ছে। বেচাকেনা অনেক কমে গেছে। খরচ আগের মতোই আছে, কিন্তু আয় কমে যাওয়ায় চিন্তায় আছি।’

অন্যদিকে গরম থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে মানুষ ভিড় করছেন ডাব, শরবত ও ঠান্ডা পানীয়ের দোকানগুলোতে। শহরের বিভিন্ন বাজার ও সড়কের পাশে এসব দোকানে ক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, বমিভাব এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

রংপুর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান জানান, উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে বর্তমানে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আকাশে মেঘের উপস্থিতি কম থাকায় সূর্যের তাপ সরাসরি ভূমিতে পড়ছে, ফলে গরম বেশি অনুভূত হচ্ছে। মঙ্গলবার ঠাকুরগাঁওয়ে সর্বোচ্চ ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।

‘আগামী কয়েক দিন তাপমাত্রা প্রায় একই রকম থাকতে পারে। সামান্য ওঠানামা হলেও দ্রুত গরম কমার সম্ভাবনা নেই। বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।’—যোগ করেন তিনি।

তাই এখন স্বস্তির বৃষ্টির অপেক্ষায় দিন গুনছেন ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ। তপ্ত মাটি আর দগ্ধ জনজীবনে বৃষ্টি যেন হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।