কালেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াল্টার ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য সূত্রাপুর-ফরাশগঞ্জ এলাকায় ধোলাইখালের ওপর একটি চমৎকার ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
ঐতিহাসিক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার ‘ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ গ্রন্থে এই দূরদর্শী প্রকল্পের কথা তুলে ধরেছেন।
একক স্প্যানের এই চেইন-লিংক ঝুলন্ত সেতুর সমস্ত উপাদান ইংল্যান্ড থেকে জাহাজে করে আনা হয়। চারটি স্তম্ভের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা এই আধুনিক সেতুটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল প্রায় দুই বছর।
এটি বাসিন্দাদের কাছে এতটাই আশ্চর্যের বিষয় ছিল, স্থানীয়ভাবে একটি ছড়া প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল— ‘ওয়াল্টার সাহেবনে পুল বানায়া; উন কা নিচে গঞ্জ বসায়া’ (ওয়াল্টার সাহেব সেতু বানালেন এবং তার নিচে বাজার বসালেন)।
১৮৬৪ সালে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি বা পৌরসভা গঠিত হওয়ার পর, ১৮৬৭ সাল থেকে খালে চলাচলকারী বড় মালবাহী নৌকা ও যানবাহনের ওপর টোল বা কর আরোপ করা হয়।
১৮৬৭ থেকে ১৮৭২ সালের মধ্যে বার্ষিক গড় টোল আদায়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ হাজার টাকা, যা ছিল সেই আমলের জন্য বিশাল অংক। পরবর্তীতে পৌরসভা এই টোল আদায়ের দায়িত্ব পুরোপুরি নিজের কাঁধে তুলে নেয়।
একটি জীবনরেখার পতন
উনিশ শতকের শেষের দিকে ধোলাইখালের পতন শুরু হয়। শুষ্ক মৌসুমে মানুষ ঘরবাড়ি তৈরির জন্য খালের পাড় দখল করতে শুরু করে। যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়।
সবশেষে ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তান আমলে ভূমিগ্রাসীদের চাপে খালটি সংকুচিত হতে থাকলে এর চূড়ান্ত বিপর্যয় নেমে আসে।
সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তে লোহারপুলও নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। ২৫ ফুট দীর্ঘ এবং ১৯ ফুট চওড়া এই সেতুটি ব্রিটিশরা শেষবারের মতো ১৯৩৫ সালে সংস্কার করেছিল। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এর রক্ষণাবেক্ষণ বন্ধ হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে কাঠামোটি পুরোপুরি হারিয়ে যায়।
আজ সেই জায়গার ওপর পিচঢালা রাস্তা তৈরি হয়েছে, নিচে চাপা পড়ে আছে বক্স কালভার্ট। জহির রায়হান নাট্যকেন্দ্রের কাছে কেবি রোড এলাকায় যেখানে একসময় সেতুটি ছিল, সেখানে এখন কোনো জলপথ বা ঝুলন্ত সেতু থাকার সামান্যতম চিহ্নও অবশিষ্ট নেই।
শুধু নামেই ইতিহাস
আজকের ধোলাইখালকে একটি ‘মৃত শহর’ হিসেবে বর্ণনা করা যায়, যেখানে খালের অবশিষ্ট অংশ এখন কেবল শহরের বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
খালের পানির সুবাস এখন পোড়া ইঞ্জিন অয়েল আর সিসার গন্ধে রূপ নিয়েছে। বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে খালের সেই প্রাণচাঞ্চল্য এবং সেতুর অস্তিত্ব।
এত কিছুর হারানোর পরেও টিকে আছে দুটি নাম–‘ধোলাইখাল’ এবং ‘লোহারপুল’। কংক্রিটের নিচে চাপা পড়া একটি বিলুপ্ত জলজ সভ্যতার শেষ দীর্ঘশ্বাস জাগানিয়া স্মারক হিসেবে এই নামগুলোর মাঝেই আজও বেঁচে আছে ইতিহাস।