প্রাণ প্রকৃতি রক্ষায় সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে সুন্দরবনে টানা তিন মাসের বার্ষিক নিষেধাজ্ঞা। এ সময় সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশ, সাধারণ মানুষের চলাচলসহ বন থেকে মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য সম্পদ আহরণ পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। তবে পরিবেশ সংরক্ষণের এই উদ্যোগে উপকূলীয় সাতক্ষীরার হাজারো বননির্ভর পরিবারের জীবিকায় নেমে আসছে অনিশ্চয়তার ছায়া।
ইতোমধ্যে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে গহীন সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে ফিরতে শুরু করেছেন জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও ট্রলারচালকরা। অনেকেই ঈদুল আজহার আগে বাড়ি ফিরলেও তাদের চোখেমুখে এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। কারণ আগামী তিন মাস বন থেকে কোনো আয় না থাকায় কীভাবে সংসার চলবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিকল্প কর্মসংস্থান বা পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা ছাড়া প্রতি বছরের মতো এবারও উপকূলের বনজীবীদের জন্য অপেক্ষা করছে দীর্ঘ অভাব-অনটনের সময়।
সম্প্রতি সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় বনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় সুন্দরবনে ওপর নির্ভরশীল পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি বনজীবী ও ট্রলারচালক বেকার হয়ে পড়বে। ফলে বন্ধের দিনগুলোয় তাদের জন্য সরকারি সহায়তার বরাদ্দ দেওয়ার দাবি তাদের।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে মৎস্যসম্পদ রক্ষায় ২০১৯ সাল থেকে প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সব নদী ও খালে মাছ-কাঁকড়া আহরণ বন্ধ রাখা হচ্ছে। সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে জলভাগের পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার, যা পুরো সুন্দরবনের আয়তনের ৩১ দশমিক ১৫ ভাগ।
সুন্দরবনের জলভাগে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া রয়েছে। জুন থেকে আগস্ট এই তিন মাস প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনের নদী ও খালে থাকা বেশির ভাগ মাছ ডিম ছাড়ে। এ কারণে ১ জুন থেকে ৯২ দিনের জন্য জেলেদের সুন্দরবনে প্রবেশের সব ধরনের অনুমতি বন্ধ রাখে বন বিভাগ।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ৩ মাস কোনো বনজীবীকে সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতিপত্র (পাস) দেওয়া হবে না। একইভাবে এ সময়ে কোনো পর্যটকেও সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারবেন না।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন বুড়িগোয়ালিনী, কৈখালী, কদমতলা ও কোবাদক ফরেস্ট স্টেশনের আওতায় ২ হাজার ৯০০টি নৌকার সুন্দরবনে প্রবেশের বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) রয়েছে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শ্যামনগরে নিবন্ধিত জেলে রয়েছে ২৩ হাজারের বেশি।
অবশ্য স্থানীয় বনজীবীরা বলছেন, শ্যামনগরে জেলেদের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে মুন্সিগঞ্জ, গাবুরা, কৈখালীসহ পদ্মপুকুর, রমজাননগর ও ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের কিছু অংশ ভৌগোলিক কারণেই সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষ-অধ্যুষিত। এসব এলাকায় অন্তত ৫০ হাজার জেলে পরিবারের বসবাস, যারা বংশপরম্পরায় বনজীবী। তারা সারা বছর সুন্দরবনসংলগ্ন নদ-নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করে।
স্থানীয়দের দাবি, জুন থেকে আগস্ট এই তিন মাস আয় বন্ধ থাকায় অধিকাংশ বনজীবী পরিবার এখন চরম অর্থকষ্টের শঙ্কায় পড়েছে। সুন্দরবনসংলগ্ন মুন্সীগঞ্জের চুনকুড়ি গ্রামের বনজীবী ইসমাইল হোসেন বলেছেন, সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া ও মধু আহরণ করেই আমাদের সংসার চলে। তিন মাস পাস বন্ধ থাকবে। ঈদের দুইদিন আগে বন থেকে বাড়িতে ফিরেছি। খুব বেশি মাছ ধরতে পারিনি। এই সপ্তাহের শুরু থেকে ফরেস্ট স্টেশন থেকে বনে ঢোকার অনুমতি দিচ্ছে না। সামনের তিন মাস বন্ধের সময় সংসার চালানোর মতো সঞ্চয় করা টাকা নেই। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
একই কথা বলেন সুন্দরবন সংলগ্ন মীরগাঙ গ্রামের আবিয়ার গাজী নামের এক মৎস্যজীবী। তিনি বলেছেন, গত মঙ্গলবার পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে সুন্দরবনের বাড়িতে ফিরে এসেছিলাম। আবার ১ জুন থেকে ৯২ দিন সুন্দরবন বন্ধ থাকবে। বন্ধের সময় সাগরে মাছ ধরা জেলেদের সরকারি সহায়তা করা হলেও সুন্দরবনের জেলেদের কিছুই দেয় না। এর মধ্যে সবকিছুর দাম বাড়তি। বন্ধের সময় সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য না করলে সামনের দিনগুলো খুবই কষ্টের মধ্যে যাবে।
নীলডুমুর পর্যটক বাহি ট্রলার মাঝি রিপন গাজী জানিয়ে, লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘদিন নোঙর করে রাখলে ট্রলারের কাঠ ও অন্যান্য অংশ দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। তিন মাস পাস বন্ধ থাকায় ট্রলারগুলো অচল পড়ে থাকবে, এতে ক্ষতির পাশাপাশি মাঝি-মালিকরা চরম আর্থিক সংকটে পড়বে।
পশ্চিম সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জার আওতাধীন আওতাধীন বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুল হকের ভাষ্য, সোমবার থেকে তিন মাসের জন্য জেলে-বাওয়ালিসহ পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই সময় মাছ ও বন্য প্রাণীর প্রজননের মৌসুম। এ সময় সুন্দরবনের নদী ও খালের মাছ ডিম ছাড়ে। তাছাড়া বর্ষাকালে সুন্দরবনের গাছের 'রিজেনারেশন' হয়। তাই এই সময়ে সুন্দরবনকে সুস্থ রাখতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে পুনরায় সুন্দরবনে প্রবেশ উন্মুক্ত করা হবে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. তৌহিদ হাসান বলেছেন, সমুদ্রগামী জেলেদের যেমন বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলেদেরও এই সময় সহায়তা দেওয়া দরকার। তাদেরও বিভিন্ন সরকারি সহায়তা পাওয়ার অধিকার আছে। আমরা তাদেরকে সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকারকে জানিয়েছি।
এদিকে বনজীবীরা জানান, প্রতি বছর তিন মাসের এই নিষেধাজ্ঞার সময়টিতে সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকার দখল নেয় কিছু প্রভাবশালী মাছ ব্যবসায়ী ও মহাজন চক্র। সাধারণ জেলে ও বাওয়ালিরা যখন নিয়ম মেনে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকেন, তখনই এই অসাধু চক্রটি সুযোগ নেয়। তাদের সহযোগিতা করে কিছু অসাধু বনরক্ষী। এই চক্রটি বনের খাল ও নদীতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করে। পরে বনের ভেতরেই মাচা তৈরি করে সেসব মাছ শুকিয়ে বাজারে বিক্রি করা হয়।
অবশ্য নিষিদ্ধ সময়ে সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে বনবিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. মশিউর রহমান।