ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়া, রোগী বহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, সমন্বয়হীনতা ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য দীর্ঘদিনের সমস্যা। দুর্ঘটনা, হার্ট অ্যাটাক কিংবা সংকটাপন্ন রোগীকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে অনেক পরিবারকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিপদাপন্ন মানুষের কাছ থেকে কয়েক কিলোমিটারের পথেও কয়েক হাজার টাকা ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এ অবস্থায় ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক’ গঠনের উদ্যোগ নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হবে, যেখানে অ্যাপ বা কল সেন্টারের মাধ্যমে রোগী দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে পারবেন। অনেকটা রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘উবার’-এর আদলে করা যায় কি না সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভাড়া নির্ধারণ, ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ও জরুরি সেবার সমন্বিত নেটওয়ার্ক তৈরির কথাও ভাবা হচ্ছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক শুধু জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সহজ করবে না, বরং দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও ভোগান্তিও কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। মূলত, বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, বলছেন তারা।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে প্রাথমিকভাবে ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গাইডলাইন প্রণয়ন, সেবার পরিধি নির্ধারণ, রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো তৈরি, অ্যাম্বুলেন্স ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু এবং বিদ্যমান স্বাস্থ্য হেল্পলাইন ১৬২৬৩-কে কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে। শুরুতে ঢাকায় পাইলট প্রকল্প চালুর কথাও ভাবা হচ্ছে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের স্বাস্থ্যসেবা অংশে বলা হয়েছিল, সময়মতো অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে যেন আর কোনো জীবন পথে হারিয়ে না যায়, সে লক্ষ্যেই জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল বা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে।
দেশের অনেক অঞ্চলে এখনো অ্যাম্বুলেন্স সেবা অপ্রতুল/ফাইল ছবি
পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ‘ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল সার্ভিস’ চালু এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে জাতীয় ডিজিটাল কল সেন্টার ও রিয়েল-টাইম রেফারেল সিস্টেম চালুর কথাও উল্লেখ রয়েছে নির্বাচনি ইশতেহারে।
এ প্রতিশ্রুতির আলোকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে গত ২৩ মে অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল) মো. খোরশেদ আলমের সভাপতিত্বে একটি প্রাথমিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
এখন তো অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছেমতো ভাড়া নেওয়া হয়। সিস্টেমে আনা গেলে সরকার নির্ধারণ করে দিতে পারে, প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া কত টাকা হবে
সভা-সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, এখনো বিষয়টি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। মূলত কীভাবে জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল কার্যকর করা যায় এবং বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে কীভাবে একই নেটওয়ার্কে আনা যায়, সেটি নিয়েই আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এখনো মূল সিদ্ধান্ত হয়নি। বড় পরিসরে স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বৈঠকের আগে এটি ছিল প্রাথমিক আলোচনা। আমরা দেখছি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে কীভাবে একটি সিস্টেমে আনা যায়।’
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিকল্পনাটি অনেকটা রাইড শেয়ারিং অ্যাপভিত্তিক সেবার মতো হতে পারে। অ্যাপ কিংবা কল সেন্টারের মাধ্যমে নিকটস্থ অ্যাম্বুলেন্স শনাক্ত করে দ্রুত রোগীর কাছে পাঠানো হবে।
অন্য একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ওভারঅল একটা অ্যাপ করার চিন্তা আছে। যেটির মাধ্যমে যে কেউ অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে পারবে, অনেকটা উবারের মতো। আবার এমআইএসের (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) মাধ্যমেও এটি করা যেতে পারে।’
তিনি জানান, ঢাকায় প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে এ সেবা চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কারণ, সবচেয়ে বেশি জরুরি পরিস্থিতি ও বিশৃঙ্খলা ঢাকাতেই দেখা যায়।
বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও কেন্দ্রীয় কোনো সমন্বয় নেই। ফলে এক এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স খালি থাকলেও অন্য এলাকায় রোগী সেবা পান না। এই সমন্বয় ঘাটতি দূর করতেই ‘অ্যাম্বুলেন্স পুল’ ধারণা সামনে এসেছে।
হাসপাতালে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও যথাযথ সেবা পান না রোগীরা/ফাইল ছবি
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জানিয়েছে, পরবর্তী পর্যায়ে বিআরটিএ, পুলিশ, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে বড় পরিসরে বৈঠক করা হবে। সেখানে প্রযুক্তিগত কাঠামো, ভাড়া, লাইসেন্সিং, ট্র্যাকিং, সেবা মান এবং মনিটরিং ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে।
যারা এখন ইচ্ছেমতো ব্যবসা করছে, তারা সিস্টেমে আসতে প্রথমে অনাগ্রহী হতে পারে। কারণ, সিস্টেমে এলে সবকিছু নিয়মের মধ্যে চলে আসবে।—বলছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের কর্মকর্তা
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল অনুবিভাগ) মো. খোরশেদ আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক এখনো প্রাথমিক পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে। মূল লক্ষ্য হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি সব অ্যাম্বুলেন্সকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনা, যেন জরুরি মুহূর্তে মানুষ দ্রুত সেবা পায় এবং অতিরিক্ত ভোগান্তি বা অনিয়মের শিকার না হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা অ্যাপভিত্তিক কিংবা কল সেন্টারনির্ভর একটি সিস্টেম নিয়ে ভাবছি, যেখানে উবারের মতো সহজে অ্যাম্বুলেন্স ডাকা যাবে। একই সঙ্গে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ও সেবার মান নিশ্চিত করার বিষয়েও কাজ হবে। তবে এটি বাস্তবায়নে অনেক স্টেকহোল্ডারকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। শুরুতে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও জনস্বার্থে কার্যকর একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।’
অ্যাম্বুলেন্স সেবায় সবচেয়ে বড় অভিযোগ অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। বিশেষ করে গভীর রাত, দুর্ঘটনা বা দূরপাল্লার ক্ষেত্রে রোগীর স্বজনদের অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়ার অভিযোগ পুরোনো।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় নেটওয়ার্ক চালু হলে সরকার ভাড়া কাঠামো নির্ধারণ করে দিতে পারে। কিলোমিটারভিত্তিক নির্দিষ্ট ভাড়া নির্ধারণের চিন্তাও রয়েছে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, এখন তো অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছেমতো ভাড়া নেওয়া হয়। সিস্টেমে আনা গেলে সরকার নির্ধারণ করে দিতে পারে, প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া কত টাকা হবে।
বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স খাতে এক ধরনের অঘোষিত সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে/ফাইল ছবি
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিদ্যমান স্বাস্থ্য হেল্পলাইন ১৬২৬৩-কে কার্যকর করার বিষয়েও প্রথম সভায় আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর আদলে একটি কেন্দ্রীয় কল সেন্টার ব্যবস্থাও বিবেচনায় রয়েছে।
কর্মকর্তারা মনে করছেন, ডিজি হেলথের এমআইএস ব্যবস্থার মাধ্যমে কল সেন্টার পরিচালনা করা গেলে রোগী, হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বিদ্যমান স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পরিচালিত বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স খাতে এক ধরনের অঘোষিত সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। তারা নতুন ব্যবস্থার বিরোধিতা করতে পারে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, যারা এখন ইচ্ছেমতো ব্যবসা করছে, তারা সিস্টেমে আসতে প্রথমে অনাগ্রহী হতে পারে। কারণ, সিস্টেমে এলে সবকিছু নিয়মের মধ্যে চলে আসবে।
‘আমাদের দেশে নতুন কিছু চালু করাই বড় চ্যালেঞ্জ। শুরুতে বাধা থাকে। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ সুবিধা বুঝতে পারলে সেটাই গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়’—যোগ করেন তিনি।