Image description

কোরবানির ঈদ মুসলমানদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব। বরাবরই এ উৎসবকে বলা হয় ত্যাগের মহিমা নিয়ে আসা উৎসব। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোরবানির ঈদকে ঘিরে সমাজে এক ধরনের প্রদর্শনের সংস্কৃতিও তৈরি হয়েছে । বড় গরু কেনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি, ভিডিও প্রকাশ, কে কত দামী পশু কিনলেন, কে কয়টা পশু কোরবানি দিচ্ছেন এসবই এখন ঈদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

আধুনিক ভোগবাদী সংস্কৃতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব ঈদের উৎসবকে দেখানোর সংস্কৃতির’ দিকে ঠেলে দিচ্ছে কী? গবেষক মো, রাহাত খান ও কৃতিকা শর্মা তাঁদের পার্সেস প্রিফারেন্স অ্যান্ড রায়িং ইনফ্লুয়েন্স অন রিলিজিয়াস অকেশন শিরোনামের গবেষণায় দেখিয়েছেন, ঈদ এখন কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি ভোক্তা-সংস্কৃতিরও একটি বড় মৌসুম। মানুষ তার আশপাশের মানুষ, প্রতিবেশী বা সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে কেনাকাটা ও প্রদর্শনের চাপে পড়ে। এই প্রবণতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও দৃশ্যমান হয়।

এসব কারণে উৎসবের অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ সহমর্মিতা, সংযম ও সামাজিক বন্ধনের জায়গা অনেক সময় আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। এতে ধীরে ধীরে কোরবানি ঈদ ত্যাগের উৎসব থেকে প্রদর্শনের উৎসবে রূপ নিচ্ছে বলে মনে করেন গবেষকেরা।

ঈদের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন পশুর হাট জমে ওঠে। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বিশালাকৃতির গরু নিয়ে আলাদা আগ্রহ দেখা যায়। সময়, প্রেক্ষাপট, পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে প্রতিবছর গরুর হাটে গরুর নাম নিয়ে থাকে বাড়তি উত্তেজনা। যেমন: এবছরের মোদি, ট্রাম্প, নেতানিয়াহু, বিসিএস ক্যাডার, বাহুবলি, রাজাবাবু, ধলাবাবু, কালাবাবু ইত্যাদি নামের গরু ক্রেতাদের আলাদা আর্কষণ কেড়েছে।

এসব গরুর ওজন, দাম ও বিশেষত্ব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে প্রচারণা। কারা কিনছেন এই গরু এসব নিয়ে যেমন চলে প্রচারণা তেমনি এসব লাখ টাকার গরুর পাশে দাঁড়িয়ে অনেকে ছবি তুলে ফেসবুক, টিকটক কিংবা ইউটিউবে প্রকাশ করেন।

শুধু পশু কেনাই নয়, কোরবানির পুরো আয়োজন এখন অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের এক নীরব প্রতিযোগিতা হয়ে উঠছে। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি চোখে পড়ে।

ফেসবুক লাইভে পশু কেনা দেখানো, ইউটিউব কনটেন্ট তৈরি কিংবা টিকটকে কোরবানির পশু নিয়ে ভিডিও বানানো এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

কর্নেল ইউনিভার্সিটির দ্য ইমপ্যাক্ট অব কন্সপিশিয়াস কনজাম্পশন ইন সোশ্যাল মিডিয়া অন পারচেজিং ইনটেনশনস শিরোনামের গবেষণায় বলা হয়েছে, ফেসবুক বা ইনটাগ্রামে মানুষ তার নিজের জীবনকে সাজানোভাবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করে। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভোগের প্রদর্শনকে উৎসাহিত করে এবং অন্যদের মধ্যেও একই ধরনের পণ্য বা জীবনধারার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে।

তবে অনেকে মনে করেন, বিষয়টিকে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বেড়েছে, তাই তারা বড় পরিসরে আয়োজন করছেন। অনেকেই এটিকে আনন্দ ভাগাভাগির অংশ হিসেবেও দেখেন। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে পশুর হাটে যাচ্ছেন, ছবি তুলছেন, স্মৃতি তৈরি করছেন এসবও আধুনিক নগরজীবনের বাস্তবতা।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা হাসনাইন রুবেল বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। সব সময় যে প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই ফেসবুকে ছবি পোস্ট করা হয়, এমন নয়। ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম এক আনন্দ ভাগাভাগিরও মাধ্যম।’

তারপরও কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, কোরবানির আসল শিক্ষাটি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? যেমন একটি ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে কর্মরত মহিবুল ইসলাম বলেন, ইসলামে কোরবানির মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও আত্মত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলা। সেখানে বাহ্যিক জাকজমক বা লোক দেখানোকে নিরুৎসাহিত করা হয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত আছে আন্তরিকতা ও তাকওয়ায়, পশুর আকার বা দামে নয়।

সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক তুলনার সংস্কৃতিও এ প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছে। একজন বড় গরু কিনলে অন্যজনও একই ধরনের পশু কেনার চাপ অনুভব করেন। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয়। অনেকেই সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে কোরবানি দেওয়ার চেষ্টা করেন, যাতে সামাজিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে। ফলে ধর্মীয় আনন্দের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে অনেক পরিবারের।

এই মানসিকতা সামাজিক অসন্তোষ ও অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা প্রতিনিয়ত বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বাহ্যিক চাকচিক্যকে সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে গ্রামবাংলায় এখনো অনেক জায়গায় কোরবানির ঈদ তুলনামূলক সরল আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেখানে প্রতিবেশীদের মধ্যে মাংস ভাগাভাগি, একসঙ্গে রান্না ও সামাজিক বন্ধনই বেশি গুরুত্ব পায়। যদিও প্রযুক্তির প্রভাবে গ্রামেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে, তবু অনেক স্থানে এখনো কোরবানির মূল চেতনার প্রতিফলন বেশি দেখা যায়।