Image description

মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত আসক্তি কীভাবে একটি সাজানো গোছানো পরিবারকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দিতে পারে, তারই এক নির্মম ও রোমহর্ষক দৃষ্টান্ত দেখল হবিগঞ্জবাসী। মোবাইলে গেম খেলতে বাধা দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে নিজের জন্মদাতা বাবাকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে এক কলেজপড়ুয়া তরুণের বিরুদ্ধে। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশ জানিয়েছে, মোবাইল আসক্ত ছেলের আঘাতেই মৃত্যু হয়েছে বাবা আব্দুস শহীদের (৫০)। নিহত শহীদ হবিগঞ্জ সদর উপজেলার অনন্তপুর এলাকার বাসিন্দা।

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের স্ত্রী পিয়ারা খাতুন (৪০) ও ছেলে মোজাম্মেল আহমেদ প্রতীককে (১৮) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার বিকেলে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশ তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। এর আগে নিহতের ভাতিজা দুলাল মিয়া বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার গভীর রাতে ঘরে বসে মোবাইল ফোনে মগ্ন ছিল প্রতীক। পড়াশোনা ফেলে গভীর রাত পর্যন্ত গেম খেলায় মত্ত থাকায় বাবা আব্দুস শহীদ তাকে বারণ করেন। এ নিয়ে পিতা-পুত্রের মধ্যে শুরু হয় তীব্র বাকবিতণ্ডা। একপর্যায়ে ছেলের পক্ষ নিয়ে বাবা শহীদের ওপর চড়াও হন মা পিয়ারা খাতুন। ঝগড়ার একপর্যায়ে ঘরে থাকা বেটন দিয়ে শহীদের মাথায় সজোরে আঘাত করা হয়। রক্তক্ষরণ হয়ে মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। গুরুতর আহত অবস্থায় স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর পরই পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে মা ও ছেলেকে আটকে করে। বুধবার বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের মরদেহ দাফন করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আব্দুস শহীদ দীর্ঘ দিন মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসজীবন কাটিয়েছেন। বাবার প্রবাসে থাকার সুবাদেই ছোটবেলা থেকে অতিরিক্ত মোবাইল আসক্ত হয়ে পড়ে প্রতীক। হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও পড়াশোনায় তার মন ছিল না। প্রবাস থেকে দেশে ফিরে ছেলেকে লাইনে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন বাবা।

হাসপাতালে লাশ নিতে আসা স্বজনরা আক্ষেপ করে জানান, প্রবাসে বাবার দীর্ঘ অনুপস্থিতি ও পারিবারিক উদাসীনতার সুযোগে প্রতীক একপ্রকার মানসিক রোগী হয়ে উঠেছিল। মোবাইলে চার্জ শেষ হয়ে গেলেও সে অস্বাভাবিক আচরণ করত। আর সেই সর্বনাশা আসক্তির চূড়ান্ত পরিণতিতে আজ একটি সাজানো পরিবার চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেল।

হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রতীক। নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে আক্ষেপ করে পুলিশকে জানায়, 'আমি ভাবতেও পারিনি বাবা মারা যাবেন। তখন মাথা ঠিক ছিল না। আঘাত করার পর বাবার মাথা থেকে রক্ত বের হতে দেখে আমার হুঁশ ফিরে আসে।'

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রিপন দাশ জানান, মোবাইলে গেম খেলতে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে স্ত্রী ও সন্তানের হামলায় গৃহকর্তা নিহত হয়েছেন। আটক মা ও ছেলে দুজনেই এই হত্যা মামলার এজাহারনামীয় আসামি। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।